আশির দশকে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে স্থানীয় রাজনীতিতে যাত্রা শুরু করা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট ২০২৬) জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার বিপরীতে বিরোধী জোটের প্রার্থী ছিলেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। সংসদে বিএনপির বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় মির্জা ফখরুলের এই জয় ছিল অনেকটা প্রত্যাশিত।
তৃণমূলের রাজনীতি থেকে উঠে আসা মির্জা ফখরুলের চার দশকের রাজনৈতিক পথচলা বেশ ঘটনাবহুল। জেলা বিএনপির নেতৃত্ব, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি এখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হতে যাচ্ছেন। ১৯৮৮ সালে স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে কোনো জাতীয় দলের প্রার্থী না হয়েও স্বতন্ত্রভাবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। সেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ময়দান থেকেই ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে তার উত্থান ঘটে।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ছাত্রজীবনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়ার সময় তিনি সক্রিয় ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন। পরবর্তীতে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির পেশাগত জীবনে প্রবেশের আগে তিনি তার রাজনৈতিক আদর্শের চর্চা অব্যাহত রাখেন।
১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকারি কলেজে দায়িত্ব পালন এবং তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেছেন। তবে সরকারি চাকরির নিরাপদ জীবন তাকে দীর্ঘকাল আটকে রাখতে পারেনি। ১৯৮৬ সালে চাকরি ছেড়ে তিনি পুরোদমে সক্রিয় রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন।
১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হওয়ার মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতির পরিসরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন তিনি। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার পথচলা শুরুতে মসৃণ ছিল না। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে পরাজিত হলেও তিনি দমে যাননি। ২০০১ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে জয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদে প্রবেশ করেন। বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয় বরণ করলেও দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় তিনি নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করেন। ২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর তিনি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০১১ সালে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। দীর্ঘ পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থাকার পর ২০১৬ সালে তিনি দলের পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন।
বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাকে মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও দলীয় সংকটের মতো কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে। দলের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মসূচির প্রধান বক্তা হিসেবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তিনি তার নিজ এলাকার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে বঙ্গভবনের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের এই যাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতির এক অনন্য অধ্যায়। স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ, মন্ত্রিসভা থেকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব—প্রতিটি ধাপ তাকে আজকের এই অবস্থানে আসার জন্য প্রস্তুত করেছে। তার এই রাজনৈতিক অভিযাত্রা কেবল একজন ব্যক্তির পদোন্নতি নয়, বরং দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা একজন নেতার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যে মানুষটি কয়েক দশক আগে (৮০ দশক) স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনিই এখন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের অধিকারী হিসেবে দেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ছাত্রজীবনেই বাম রাজনীতির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর দুই বছর পরই তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় নির্বাচনী সাফল্য আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্থানীয় সরকারের এই দায়িত্ব তাকে সরাসরি জনগণের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এরপর সামরিক স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তৃণমূলের পৌর চেয়ারম্যান থেকে রাষ্ট্রীয় নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রে তার প্রবেশ ঘটে এই পর্যায়ে।

