হযরত ইদরিস (আ.) জীবনকাল: সম্পূর্ণ বিস্তারিত আলোচনা

OurDesh.com

হযরত ইদরিস (আ.) ছিলেন মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম যুগের একজন মহান নবী। তিনি ছিলেন হযরত আদম (আ.)-এর বংশধর এবং নূহ (আ.)-এর আগের নবী। কুরআনুল কারিমে তাঁর নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে। হযরত ইদরিস (আ.) এমন এক যুগে নবুয়ত লাভ করেন, যখন মানুষ ধীরে ধীরে দ্বীন থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল এবং পার্থিব জীবনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হয়ে পড়ছিল।

বংশ ও পরিচয়

ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, হযরত ইদরিস (আ.) ছিলেন হযরত আদম (আ.)-এর ষষ্ঠ বা সপ্তম প্রজন্মের সন্তান। তাঁর নাম ছিল ‘ইদরিস’, যার অর্থ—যিনি বেশি অধ্যয়ন করেন বা জ্ঞানে উন্নত। অনেক আলেমের মতে, বাইবেলে যাঁকে ‘Enoch’ বলা হয়েছে, তিনিই হযরত ইদরিস (আ.)।

নবুয়ত লাভ ও যুগের অবস্থা

হযরত আদম (আ.)-এর ইন্তেকালের বহু বছর পর মানুষ আবার শিরক, অন্যায় ও অবাধ্যতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। তখন আল্লাহ তাআলা হযরত ইদরিস (আ.)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করেন। তাঁর মূল দাওয়াত ছিল—তাওহিদ প্রতিষ্ঠা, নৈতিকতা রক্ষা এবং আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবনযাপন।

জ্ঞান, লেখনী ও সভ্যতায় অবদান

হযরত ইদরিস (আ.) সম্পর্কে বলা হয়, তিনি ছিলেন ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি যিনি লেখনী ব্যবহার করেন। তিনি মানুষকে পড়া-লেখা, হিসাব-নিকাশ, সময় গণনা এবং পরিকল্পিত জীবনযাপনের শিক্ষা দেন। অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনায় আছে—তিনি মানুষকে কাপড় সেলাই করা ও পরিধানের পদ্ধতিও শিখিয়েছিলেন।

এই কারণে তাঁকে মানব সভ্যতার একজন বড় শিক্ষক বলা হয়। তাঁর মাধ্যমে মানুষ শুধু ইবাদত নয়, বরং সামাজিক ও ব্যবহারিক জীবনের শৃঙ্খলা শিখতে শুরু করে।

সহিফা ও দ্বীনি শিক্ষা

হযরত ইদরিস (আ.)-এর ওপর আল্লাহ কিছু সহিফা (ছোট আসমানি গ্রন্থ) নাজিল করেছিলেন। এসব সহিফায় আল্লাহর ইবাদত, ন্যায়বিচার, আমানতদারি, ধৈর্য ও আখিরাতের প্রতি প্রস্তুতির নির্দেশনা ছিল। তিনি মানুষকে বুঝাতেন—দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আখিরাতই চিরস্থায়ী।

দাওয়াত ও বিরোধিতা

হযরত ইদরিস (আ.) তাঁর জাতিকে নিরলসভাবে আল্লাহর পথে ডাকেন। তবে সবাই তাঁর কথা গ্রহণ করেনি। অনেকেই তাঁকে উপহাস করত এবং বলত—এত নিয়মকানুনের কী দরকার? তবুও তিনি ধৈর্য হারাননি। তিনি নরম ভাষায়, যুক্তি ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে দাওয়াত চালিয়ে যান।

কুরআনে ইদরিস (আ.)

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন— “আর স্মরণ কর কিতাবে ইদরিসকে। নিশ্চয়ই তিনি ছিলেন একজন সত্যবাদী নবী। এবং আমি তাঁকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছি।”
(সূরা মারইয়াম: ৫৬–৫৭)

এই আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়—ইদরিস (আ.) ছিলেন অত্যন্ত সত্যবাদী এবং আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন।

‘উচ্চ স্থানে উন্নীত’ করার অর্থ

আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন—আল্লাহ তাঁকে আসমানে তুলে নিয়েছেন। কেউ বলেন—এটি তাঁর মর্যাদা ও সম্মানের কথা বোঝায়। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত ও চূড়ান্ত কোনো দলিল নেই। আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো—আল্লাহ তাঁর প্রতি বিশেষ সন্তুষ্ট ছিলেন।

ধৈর্য ও তাকওয়ার জীবন

হযরত ইদরিস (আ.) ছিলেন অত্যন্ত তাকওয়াবান। তিনি দিনের বড় একটি অংশ ইবাদতে কাটাতেন এবং রাতের বেলা আত্মসমালোচনায় লিপ্ত থাকতেন। তাঁর জীবন ছিল পরিশ্রম, ইবাদত ও জ্ঞানের সমন্বয়।

ইদরিস (আ.)-এর ইন্তেকাল

তাঁর ইন্তেকাল সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত তথ্য নেই। ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, তিনি কয়েক শত বছর জীবিত ছিলেন। তবে সঠিক বয়স আল্লাহই ভালো জানেন।

হযরত ইদরিস (আ.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা

১. জ্ঞান ও ঈমান একসাথে থাকলে সমাজ আলোকিত হয়।
২. সত্যবাদিতা মানুষকে আল্লাহর নিকট সম্মানিত করে।
৩. দুনিয়ার উন্নতির সঙ্গে আখিরাতের প্রস্তুতি জরুরি।
৪. ধৈর্য ও প্রজ্ঞা দিয়ে দাওয়াত দিলে তার প্রভাব স্থায়ী হয়।
৫. আল্লাহ তাকওয়াবান বান্দাকে উচ্চ মর্যাদা দান করেন।

উপসংহার

হযরত ইদরিস (আ.) শুধু একজন নবী নন, তিনি মানব সভ্যতার প্রাথমিক যুগের এক মহান সংস্কারক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—ইবাদত, জ্ঞান ও নৈতিকতা একসাথে চললেই মানুষ প্রকৃত সফলতা অর্জন করতে পারে।