ডলার সংকট ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা লোকসানের মুখে বিএমএসআইএল

মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে গড়ে ওঠা বসুন্ধরা মাল্টি স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (বিএমএসআইএল) মেগা স্টিল প্রকল্পটি বর্তমানে চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কারখানাটি এখনো উৎপাদনে যেতে পারেনি, অথচ এরই মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯৫৮ কোটি টাকা লোকসানের মুখে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বছরে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন স্টিল উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি শুরু হলেও, নানা জটিলতায় এর কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

২০২২ সালে প্রায় ৭০ একর জমির ওপর এই কারখানা নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক বিনিয়োগ পরিকল্পনা ছিল ৪ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। তবে ডলারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ঋণের সুদ, বিলম্ব এবং অন্যান্য আর্থিক চাপের কারণে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ১১৮ কোটি টাকায়। ফলে উৎপাদন শুরুর আগেই প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রকল্পের ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানির জন্য কয়েকটি ব্যাংকের সিন্ডিকেটেড টার্ম লোনের মাধ্যমে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকার এলসি খোলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ২৭৫টি কনটেইনারে করে দেশে পৌঁছায়। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি নির্দেশনার কারণে বসুন্ধরা নামধারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একই ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিবেচনা করে এলসির ডকুমেন্ট আটকে দেওয়া হয়। এর ফলে কনটেইনারগুলো দীর্ঘ সময় বন্দরে পড়ে থাকে এবং শুধু বন্দর ও শিপিং-সংক্রান্ত ড্যামারেজ বাবদই প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। অর্থাৎ যন্ত্রপাতির মূল্যের চেয়ে ড্যামারেজ ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় অনেক বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকল্পটির অর্থায়নে অগ্রণী ব্যাংকের নেতৃত্বে আটটি ব্যাংকের একটি কনসোর্টিয়াম গঠন করা হয়েছিল, যার মধ্যে সোনালী, জনতা, রূপালী ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ অন্যান্যরা যুক্ত ছিল। এই কনসোর্টিয়াম ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড টার্ম লোন অনুমোদন করলেও এখন পর্যন্ত ছাড় হয়েছে মাত্র ৫৭৬ কোটি টাকা, যা অনুমোদিত ঋণের মাত্র ২৪ দশমিক ৫১ শতাংশ। বাকি ১ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা এখনো ছাড় হয়নি।

৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির সুদ ও আবগারি শুল্ক দাঁড়িয়েছে ৮৫৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সিন্ডিকেটেড ঋণের বিতরণকৃত অংশের ওপর ২৪৬ কোটি এবং ফোর্সড লোনের ওপর ৬১১ কোটি টাকা সুদ ধার্য করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত বিএমএসআইএল নিজস্ব উৎস ও স্পন্সর ইকুইটি থেকে ৪১১ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।

২০২৬ সালের এপ্রিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশে অগ্রণী ব্যাংককে বিএমএসআইএলকে পৃথকভাবে বিবেচনার পরামর্শ দেওয়া হলেও তত দিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, যদি সময়মতো ডকুমেন্ট হস্তান্তর করা হতো, তবে কনটেইনারগুলো ছাড়িয়ে যন্ত্রপাতি কারখানায় নেওয়া সম্ভব হতো।

আর্থিক সংকটের পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ নিয়েও জটিলতা ছিল। অর্থনৈতিক অঞ্চলের অভ্যন্তরে ইউটিলিটি অবকাঠামো স্থাপনের জন্য বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ প্রায় ২৯০ কোটি টাকা অগ্রিম পরিশোধ করে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে ২৫০ কোটি, গ্যাস সংযোগে ৪০ কোটি এবং পানির লাইনে ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি দৈনিক ৩ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফুট গ্যাস সরবরাহের অনুমোদন দিলেও সংযোগ পেতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়।

সাফওয়ান বসুন্ধরা গ্লোবাল-এসবিজির চিফ অপারেটিং অফিসার শাহেদ জাহিদ জানান, উন্নত ও নিম্ন-নিঃসরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে রিবার কয়েল ও ওয়্যার রড উৎপাদনের লক্ষ্যেই এই বিনিয়োগ করা হয়েছে। প্রকল্পটি প্রকৌশল গ্র্যাজুয়েট ও দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। তবে নির্ধারিত সময় ২০২৪ সালে কমিশনিং হওয়ার কথা থাকলেও, এখন ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ কারখানাটি উৎপাদনে যাওয়ার আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএম) প্রেসিডেন্ট শওকত আজিজ রাসেল মনে করেন, একজন ব্যবসায়ীকে এককভাবে দায়ী করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ডলারের দর বৃদ্ধি এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নীতি প্রণয়নে ঘাটতির কারণে ব্যবসায়ীরা সংকটে পড়েছেন। তাঁর মতে, অর্থনীতিতে অর্থের স্বাভাবিক সঞ্চালন ছাড়া বড় শিল্প প্রকল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, বিএমএসআইএল চালু হলে দেশের স্টিল খাতে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং প্রতি টন রড উৎপাদনে প্রায় ৩ হাজার টাকা সাশ্রয় হতে পারে। সরবরাহ শৃঙ্খলার সীমাবদ্ধতা ও বন্দর জট নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দশকের দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশের স্টিল শিল্প বছরে ১১ থেকে ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দায়িত্বে থাকা কিছু ব্যক্তি হিংসা ও লোভের কারণে দেশ ও জনগণের ব্যাপক ক্ষতি করে ফেলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমনই এক ঘটনার শিকার হয়েছে একটি স্টিল মিলস। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২৭৫ কনটেইনারে থাকা সেই যন্ত্রপাতি কারখানায় পৌঁছানোর আগেই আটকে যায় দীর্ঘ সময়ের জন্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উন্নত প্রযুক্তি ও তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়কে সামনে রেখে প্রকল্পটির নকশা করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধানের সৌজন্য সাক্ষাৎ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ছুটির দিনেও রোমে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিশেষ কনস্যুলার সেবা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২২ সালে যখন এলসিগুলো খোলা হয়, তখন ডলারের দাম ছিল প্রায় ৮৪ থেকে ৮৬ টাকা।