যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব একটি ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তিতে সই করেছে, যার মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশটি একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার সুযোগ পাবে। ‘শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি’ হিসেবে পরিচিত এই চুক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, এটি সৌদি আরবের পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের সুযোগ তৈরি করবে। চুক্তির পাশাপাশি একটি দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সুরক্ষা চুক্তিও সই হয়েছে, যা কয়েক দশকব্যাপী বহু বিলিয়ন ডলারের অংশীদারিত্বের আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্তাবলি এখনো প্রকাশ করা হয়নি, তবে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে এই চুক্তির আওতায় সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হতে পারে। যদিও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতেও ব্যবহারের সক্ষমতা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই বিধান চুক্তিতে থাকে তবে এটি অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সৌদি সরকার জানিয়েছে, এই চুক্তি তাদের জ্বালানি খাতে বিদ্যমান সহযোগিতারই একটি সম্প্রসারণ। গত নভেম্বরে সৌদি নেতার ওয়াশিংটন সফরের পরই এই চুক্তির পথ প্রশস্ত হয়। বর্তমান সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাতের তীব্রতা এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক ‘সামুদ্রিক অবরোধ’ ঘোষণার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তিটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিমধ্যে সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি ইরানের হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, এই চুক্তি পারমাণবিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখবে এবং এতে মার্কিন উদ্ভাবিত বিশ্বের সেরা প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে। তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে ইসরাইলের বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচি বিষয়ক পরিচালক রোজমেরি কেলানিক মন্তব্য করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আগে কোনো দেশকে তাদের নিজস্ব মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করেনি, তাই এটি বিস্ময়কর হতে পারে।
চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য মার্কিন কংগ্রেসে পাঠানো হবে। রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কংগ্রেসের উভয় কক্ষের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে এর বিরোধিতা হতে পারে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সমালোচকদের উদ্বেগ নাকচ করে দিয়ে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনো চুক্তি করবে না যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ায়। অন্যদিকে ডেমোক্রেট সিনেটর এডওয়ার্ড মার্কি এই চুক্তির কঠোর সমালোচনা করে একে ভণ্ডামি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, একদিকে ইরানের পারমাণবিক বোমা ঠেকানোর অজুহাতে যুদ্ধ শুরু করা হচ্ছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের মতো দেশকে পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে এবং বাণিজ্যিক সুবিধা পাওয়ার আশায় যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিতে এগিয়েছে, যা থেকে ইসরাইলকে স্বীকৃতির শর্তটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে করা চুক্তির তুলনায় এটি ভিন্ন হতে পারে, কারণ আমিরাত নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন করে না। সৌদি আরব বহু বছর ধরেই এমন চুক্তির জন্য তদবির করে আসছিল। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৮ সালে সিবিএস নিউজকে বলেছিলেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করলে তারাও একই পথ অনুসরণ করবে।

