রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলেরও প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ, রয়েছে ১৯৯১ সালের নজির

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর সংবিধান অনুযায়ী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। দেশের সর্বোচ্চ এই সাংবিধানিক পদে নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন খুব দ্রুতই তফসিল ঘোষণা করতে যাচ্ছে। যেহেতু জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, তাই দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা দল বিএনপি যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনিই জয়ী হবেন—এটি প্রায় নিশ্চিত। তবে দেশের সংবিধানে বিরোধী দল থেকে এই পদে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই এবং অতীতে এমন নজিরও রয়েছে। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকা সত্ত্বেও এই পদে বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে মনোনয়ন দিয়েছিল, যদিও তিনি বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান বিশ্বাসের কাছে পরাজিত হন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দেশে একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন এবং তিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন। এছাড়া ৪৮(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য কোনো ব্যক্তির বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং তাকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। অর্থাৎ, রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য আগে থেকে সংসদ-সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়; কেবল সংসদ-সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকলেই যে কেউ এই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। সংবিধানের কোনো অংশে বলা নেই যে কেবল সরকারি দলই রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিতে পারবে। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী বিরোধী দল বা অন্য যেকোনো সদস্য সংবিধানে বর্ণিত যোগ্যতাসম্পন্ন যেকোনো ব্যক্তিকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিতে পারেন, তবে চূড়ান্ত জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের ভিত্তিতে。

বাংলাদেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ তৈরি হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। সংসদীয় পদ্ধতির অধীনে সেটিই ছিল প্রথম পরোক্ষ নির্বাচন। সে সময় ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আবদুর রহমান বিশ্বাসকে এবং বিরোধী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সাবেক প্রধান বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরীকে মনোনীত করে। নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন এবং ১৯৯১ সালের ১০ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন, অন্যদিকে বদরুল হায়দার চৌধুরী পান ৯২ ভোট।

এর আগে, ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘ ৯ বছরের স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১টি আসন না থাকায় জামায়াতে ইসলামীর সমর্থনে সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনে দলভিত্তিক আসন বিন্যাসে বিএনপি ১৪০টি, আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, বাকশাল ৫টি, সিপিবি ৫টি, ইসলামী ঐক্য জোট ১টি, এনডিপি ১টি, ন্যাপ ১টি, জাসদ (সিরাজ) ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৩টি আসন লাভ করেন।

তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ ধারণা করেছিল যে জাতীয় পার্টি, জামায়াত এবং সমমনা বাম দলগুলোর সমর্থন পেলে তারা রাষ্ট্রপতি পদে জয়ী হতে পারবে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী তৎকালীন জামায়াত আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের সঙ্গে দেখা করে সমর্থন চাইলেও জামায়াত তাতে রাজি হয়নি। ফলে ভোটের দিন আওয়ামী লীগের প্রার্থী নিজস্ব ৮৮ আসনের সঙ্গে সমমনা মাত্র ৪ জন সদস্যের ভোট পেয়ে মোট ৯২ ভোট পান। অন্যদিকে বিএনপির আব্দুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন এবং জাতীয় পার্টির সদস্যরা ভোটদানে বিরত থাকেন। ১৯৯১ সালের পর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনগুলোর বেশিরভাগই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সম্পন্ন হয়েছে অথবা মনোনয়ন পর্বেই শেষ হয়ে গেছে, যার কারণে ১৯৯১ সালের নির্বাচনটি একটি অনন্য নজির হিসেবে বিবেচিত হয়।

রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হতে সংসদ-সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়—এর প্রমাণ হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ এবং সদ্যবিদায়ি মো. সাহাবুদ্দিনের নাম উল্লেখ করা যায়। এই তিনজনের কেউই কখনো জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাবেক ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে মনোনয়ন দিলে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০০২ সালে একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর বিএনপি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে মনোনয়ন দিলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সদ্যবিদায়ি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনও একইভাবে সংবিধানের ৪৮(৪) অনুচ্ছেদের যোগ্যতা পূরণ করে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন।

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতেও সংসদে বিরোধী দল চাইলে নিজস্ব প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। তবে বর্তমান প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এই পদে কাউকে মনোনয়ন দেবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দলের কোনো ফোরামে আলোচনা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।