ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বালি-ইটের সাম্রাজ্য: দুর্ঘটনা ও যানজটে জনজীবন বিপর্যস্ত

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে বালি-ইটের সাম্রাজ্য, জনজীবন বিপর্যস্ত

জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর থেকে খাড়াজোড়া পর্যন্ত অংশটি বর্তমানে বালি, ইট এবং গাড়ি ধোয়ার একটি বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। মহাসড়কের ফুটপাত ও সড়ক ও জনপথ বিভাগের সরকারি জায়গা দখল করে সেখানে পাহাড়ের মতো বালি-পাথরের স্তূপ, লক্ষ লক্ষ ইট এবং পানির মোটর স্থাপন করে প্রকাশ্যে যানবাহন ধোয়ার কাজ চলছে। এর ফলে প্রতিদিনকার দুর্ঘটনা, তীব্র যানজট এবং জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। এই পরিস্থিতিতে স্কুল-কলেজগামী হাজার হাজার শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

কালিয়াকৈর বাজার থেকে শুরু করে খাড়াজোড়া, শিলাবৃষ্টি পাম্প এবং বোড়ঘর এলাকা পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশের ফুটপাত সম্পূর্ণভাবে দখল হয়ে গেছে। ফুটপাতের উপর ১০-১৫ ফুট উঁচু করে বালি ও পাথরের পাহাড় জমা করা হয়েছে। এর পাশেই সারি সারি লক্ষ লক্ষ ইটের স্তূপ দেখা যায়। সেমি-পাকা টিনশেডের নিচে সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে সেই পানি দিয়ে ট্রাক, লরি, পিকআপ, বাসসহ শতাধিক যানবাহন প্রতিদিন মহাসড়কের গা ঘেঁষে ধোয়া হচ্ছে।

মহাসড়কের প্রায় অর্ধেক জায়গা দখল হয়ে যাওয়ায় যানবাহন চলাচলের জন্য রাস্তা অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দুই লেনের রাস্তা কার্যত দেড় লেনে নেমে এসেছে, যা চালকদের জন্য মারাত্মক ভোগান্তির কারণ হচ্ছে।

চালক ও স্থানীয়দের অভিযোগ

চালক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, লরি ও ট্রাক থেকে বালি-পাথর ছিটকে প্রায়শই মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের উইন্ডশিল্ড ভেঙে যাচ্ছে। পাম্পের পানি ও বালির কারণে সড়ক সারাক্ষণ পিচ্ছিল থাকছে, যা প্রায়শই ব্রেক ফেল এবং স্কিড করে দুর্ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।

কালিয়াকৈর থেকে ঢাকাগামী বাস চালক রফিকুল ইসলাম বলেন, “সড়কের অর্ধেক জায়গা দখল করে বালি রাখা হয়েছে। পাশ দিয়ে যেতে গেলে গাড়ি কেঁপে ওঠে। মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়াই যায় না। বড় দুর্ঘটনা যে কোনো সময় ঘটতে পারে।”

এক মোটরসাইকেল চালক রাসেল জানান, বালির ট্রাক থেকে পাথর এসে তার বাইকের কাঁচ ভেঙেছে এবং পিচ্ছিল রাস্তায় তিনি দুবার পড়েও গেছেন।

শিক্ষার্থী ও পথচারীদের ভোগান্তি

ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে মহাসড়কের উপর দিয়েই চলাচল করছেন। স্থানীয় অভিভাবক সালমা বেগম বলেন, “আমার মেয়ে কলেজে যায়। ফুটপাত না থাকায় সে সড়কের পাশ দিয়েই হাঁটে। বালির ট্রাক আর দ্রুতগামী গাড়ির ভয়ে সবসময় আতঙ্কে থাকি।”

কালিয়াকৈর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নাদিয়া বলেন, “ক্লাসে যেতে রোজ ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। ফুটপাত থাকলে এত ভয় লাগত না।” বালি-ইট লোড-আনলোডের সময় ট্রাক ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে দাঁড়িয়ে থাকায় কালিয়াকৈর, খাড়াজোড়া, শিলাবৃষ্টি পাম্প ও বোড়ঘর এলাকায় প্রতিদিন ১-২ ঘণ্টা স্থায়ী যানজট লেগে যায়। এতে পণ্যবাহী ট্রাক আটকে থাকে, যাত্রীবাহী বাস সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না এবং জরুরি অ্যাম্বুলেন্সও মুমূর্ষু রোগী নিয়ে আটকে পড়ে চরম ভোগান্তির শিকার হয়।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ও প্রশাসনের আশ্বাস

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বালি ব্যবসায়ী জানান, তারা জায়গা ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন এবং বিকল্প জায়গা না পেলে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হবে। তারা চেষ্টা করেন যেন সড়কে বালি না পড়ে।

গাজীপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মহাসড়কের ভূমি সরকারি সম্পত্তি এবং ফুটপাত ও সড়কের জায়গা দখল করে ব্যবসা করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ ও সড়ক আইন-২০০৯ অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি আরও বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের সহায়তায় নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয় এবং অভিযোগ পেলে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে উচ্ছেদ ও জরিমানা করা হবে।

কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হুসাইন বলেন, মহাসড়কের জায়গা দখল করে বালি-ইট রাখা এবং পানির পাম্প বসিয়ে ব্যবসা করা আইনত দণ্ডনীয়। জনদুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার কথা বিবেচনা করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পুলিশ এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের দাবি

পথচারী ও স্থানীয়দের দাবি, কয়েক দিনের মধ্যে মহাসড়কের ফুটপাত ও সড়কের জায়গা দখলমুক্ত করে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে হবে। বালি-ইটের ব্যবসা আবাসিক এলাকা ও মহাসড়ক থেকে দূরে নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর করতে হবে। সড়ক ঘেঁষে পানির পাম্প বসিয়ে গাড়ি ধোয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং অবৈধ পাম্পগুলো উচ্ছেদ করতে হবে।

স্থানীয়রা জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর-খাড়াজোড়া অংশে বালি-ইট-পাথর রেখে ও পাম্প বসিয়ে সরকারি ফুটপাত-সড়ক দখল করার ফলে দুর্ঘটনা ও তীব্র যানজট বাড়ছে। পিচ্ছিল সড়ক ও সংকুচিত লেনে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, পথচারী ও চালকরা ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রশাসন অবৈধ দখল স্বীকার করে দ্রুত যৌথ উচ্ছেদ অভিযানের আশ্বাস দিয়েছে। স্থানীয়রা মহাসড়ক দ্রুত দখলমুক্ত করে বালি-ইটের ব্যবসা নির্ধারিত স্থানে সরানোর দাবি জানিয়েছে।