অন্তরঙ্গ ভিডিও ফাঁসের আশঙ্কায় জোবায়েদ হত্যা: তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. জোবায়েদ হোসাইন হত্যার ঘটনায় প্রায় ৯ মাসের তদন্ত শেষে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে পুলিশ। অন্তরঙ্গ ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ, যা এক মাস ধরে পরিকল্পনা করে কার্যকর করা হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত ৩০ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বংশাল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আশরাফ হোসেন আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে অভিযুক্ত করা হয়েছে ১৯ বছর বয়সী ছাত্রী বার্জিস শাবনাম বর্ষা, তাঁর প্রেমিক ১৯ বছর বয়সী মাহির রহমান এবং মাহিরের বন্ধু ২১ বছর বয়সী ফারদীন আহম্মেদ আয়লানকে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মাহির ছিলেন মূল হামলাকারী, বর্ষা হত্যার পরিকল্পনাকারী এবং আয়লান সহযোগী।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বর্ষা ও মাহিরের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। একপর্যায়ে তাঁদের সম্পর্কে বিচ্ছেদ হলে গৃহশিক্ষক জোবায়েদের সঙ্গে বর্ষার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মোবাইল ফরেনসিক বিশ্লেষণে জোবায়েদ ও বর্ষার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের তথ্যও পাওয়া গেছে। পরে মাহিরের সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক আবার শুরু হলে জোবায়েদের কাছে থাকা ছবি ও ভিডিও ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বর্ষা ও মাহির তাঁকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এ কারণেই গত বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁরা জোবায়েদকে হত্যার পরিকল্পনা শুরু করেন এবং প্রায় এক মাস ধরে বিভিন্নভাবে পরিকল্পনা করে শেষ পর্যন্ত হত্যার সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যার ৮ থেকে ৯ দিন আগে মাহির ও তাঁর বন্ধু আয়লান ঘটনাস্থল পুরান ঢাকার আরমানিটোলার ১৫ নুরবক্স লেনের রৌশান ভিলা ঘুরে দেখেন এবং দুটি সুইচ গিয়ার ছুরি কেনেন। কয়েক দিন ধরে জোবায়েদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তাঁরা সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। অভিযোগপত্রে মাহিরের জবানবন্দির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বর্ষা তাঁকে নিয়মিত জোবায়েদকে হত্যা করতে চাপ দিতেন এবং ধরা পড়লে তাঁদের পরিবারে অনেক আইনজীবী আছেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। বর্ষা মাহিরকে হত্যার জন্য ৬০০ টাকা মূল্যের দুটি সুইচ গিয়ার ছুরি কেনার জন্য বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠিয়েছিলেন।

গত বছরের ১৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় জোবায়েদকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ঘটনার দিন বিকেল ৪টা ২৭ মিনিটে জোবায়েদ নিজের লাইভ লোকেশন বর্ষাকে পাঠান। সেই তথ্য পাওয়ার পরই ওত পেতে থাকা মাহির ও আয়লান হামলা চালান। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, জোবায়েদের ঘাড়ে প্রায় ১০ ইঞ্চি লম্বা সুইচ গিয়ার ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়, এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। ফরেনসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছুরির আঘাতে জোবায়েদের গলার ডান পাশের ক্যারোটিড আর্টারি ও ইন্টারনাল জুগুলার ভেইন ছিন্ন হয়ে যায়। উদ্ধার হওয়া ছুরিতে মাহিরের ডিএনএও পাওয়া গেছে।

হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় জোবায়েদ কোনোভাবে সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠে বর্ষার সামনে যান এবং তাঁকে বাঁচানোর আকুতি জানান। অভিযোগপত্রে বর্ষার জবানবন্দিতে স্বীকারোক্তি উল্লেখ করা হয়েছে যে, সে সময় তিনি জোবায়েদকে বলেছিলেন, ‘তোর মতো পাপিকে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত।’ পুলিশ আরও দাবি করেছে যে, হত্যার কয়েক দিন আগেই মাহির ও আয়লান জোবায়েদকে সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন এবং বর্ষাকে আর না পড়ানোর জন্য সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু জোবায়েদ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আশরাফ হোসেন জানান, হত্যার আগের রাত পর্যন্তও বর্ষা ও জোবায়েদের মধ্যে প্রেমিক-প্রেমিকার মতো কথোপকথন হয়েছিল। ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ ও ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্ষা অত্যন্ত সুকৌশলে যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন, ফলে জোবায়েদ কোনোভাবেই হত্যার পরিকল্পনার আভাস পাননি।

জোবায়েদ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কুমিল্লা জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সভাপতি ছিলেন। তিনি ফরাশগঞ্জে একটি মেসে থাকতেন এবং রৌশান ভিলাতেই বর্ষাকে টিউশনি করাতেন। এ ঘটনায় এক দিন পর নিহত জোবায়েদের বড় ভাই এনায়েত হোসেন সৈকত বাদী হয়ে বংশাল থানায় হত্যা মামলা করেন।

অভিযোগপত্রে ৫০ জন সাক্ষীর বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফরেনসিক, ডিএনএ পরীক্ষা ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক আলামতের বিশ্লেষণ যুক্ত করা হয়েছে। বাদীপক্ষের আইনজীবী ইশতিয়াক হোসেন জিপু বলেন, অভিযোগপত্রে দেওয়া ডিএনএ প্রতিবেদন মাহিরের সঙ্গে মিলে গেছে এবং তাঁর ১৬৪ ধারার জবানবন্দিসহ গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। মাহিরের বের হওয়ার সুযোগ নেই, কেউই ছাড় পাবেন না।

আদালতের প্রসিকিউশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগপত্রটি গত ১৩ জুলাই জিআরও শাখায় পৌঁছেছে। ওই দিন যথাসময়ে উপস্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় আগামী ১২ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। অভিযুক্ত বর্ষার মা আনিকা রহমান গত ১৪ জুলাই বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, আমার মেয়ে নির্দোষ। এখনো বলছি, আমার মেয়ে নির্দোষ।’ অন্যদিকে, জোবায়েদের বড় ভাই ও মামলার বাদী এনায়েত হোসেন বলেন, যেহেতু এটি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা, বিচারিক প্রক্রিয়া যেন দ্রুত শুরু ও শেষ হয়, এটাই তাঁর চাওয়া। দ্রুত বিচার হলে মানুষ বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নেবেন।