বন্যা ও দুর্যোগে আর্তমানবতার সেবা করা একটি মহৎ ইবাদত

মানুষের সেবা করা এবং মানবপ্রেম এমন এক মহান আমল, যার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় হওয়া যায়। সৃষ্টির প্রতিটি জীব আল্লাহর পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, তাই যারা আল্লাহর পরিবারের প্রতি অনুগ্রহ প্রদর্শন করে, তারাই তাঁর কাছে সর্বাধিক প্রিয়। নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের মতো ফরজ ইবাদতের হিসাব যখন কঠিন হবে, তখন এই সৃষ্টিসেবা নাজাতের অসিলা হিসেবে কাজ করবে। ইসলামে মানবসেবা বলতে অভাবীর অভাব দূর করা, গরিব-অসহায়দের অন্ন-বস্ত্র দেওয়া, বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থের সেবা করা এবং মজলুমের ফরিয়াদে সাড়া দেওয়াকে বোঝায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, যতক্ষণ মানুষ অন্যের সহযোগিতায় নিয়োজিত থাকে, ততক্ষণ মহান আল্লাহ তার সহযোগিতায় থাকেন (মুসলিম: ২৬৯৯)। এছাড়া রাস্তায় পড়ে থাকা কাঁটাযুক্ত ডাল সরিয়ে ফেলার মতো সাধারণ কাজও আল্লাহ কবুল করে ক্ষমা করে দেন (বোখারি: ৬৫২)।

ইসলামে মানবসেবা কেবল মানবিকতা নয়, বরং একে ঈমানের অঙ্গ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। নামাজ ও রোজার মতোই মানবসেবা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যার যেমন সামর্থ্য—সম্পদ, বুদ্ধি বা শারীরিক শক্তি—তা দিয়ে মানুষের সেবা করা উচিত। রাসুল (সা.) বলেছেন, কেউ পূর্ণাঙ্গ মোমিন হতে পারবে না যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, অন্যের জন্যও তা ভালোবাসবে (বোখারি: ১৩)। পবিত্র কোরআনেও জান্নাতিদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, তারা আল্লাহর প্রেমে অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিদের আহার দান করে এবং এর বিনিময়ে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা কামনা করে না (সুরা দাহর: ৮-৯)।

আমরা নিজের জন্য যেমন নিরাপত্তা, সুখ-শান্তি ও মঙ্গল কামনা করি, অন্যের জন্যও তেমনটা কামনা করাই ইসলামের শিক্ষা। রাসুল (সা.) বলেছেন, দয়াময় আল্লাহ দয়ালুদের ওপর দয়া করেন; সুতরাং তোমরা জমিনবাসীদের ওপর দয়া করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের ওপর দয়া করবেন (তিরমিজি: ১৯২৪)। এতিম বা অনাথের রক্ষণাবেক্ষণকারী জান্নাতে রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে পাশাপাশি থাকবেন বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল মিলিয়ে দেখিয়েছেন (তিরমিজি: ১৯১৮)।

মানবসেবার ফজিলত অপরিসীম। মানবসেবার একটি ফজিলত হলো, মানবসেবা দ্বারা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাজাত লাভ করা যায়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ শুধু তার আমল দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (মুসনাদে আহমদ: ৭৪৭৯)। নেক আমলের পাশাপাশি আল্লাহর রহমত থাকলেই নাজাত পাওয়া যাবে। আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম সহজ পথ হলো তাঁর সৃষ্টির উপকারে হাত বাড়িয়ে দেওয়া। রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তি সবচেয়ে প্রিয়, যে মানুষের বেশি উপকার করে। মুসলমানের হৃদয়ে আনন্দ দেওয়া, বিপদ দূর করা বা ঋণ পরিশোধের মতো কাজগুলো আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় (মাজমাউয যাওয়ায়েদ: ৮/১৯১)। এমনকি কিয়ামতের দিন আল্লাহ বান্দাকে প্রশ্ন করবেন কেন সে অসুস্থ বা ক্ষুধার্তকে সাহায্য করেনি, কারণ তাদের সেবা করা মানেই পরোক্ষভাবে আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়া (মুসলিম: ২৫৬৯)।

নবীজি (সা.)-এর জীবনে মানবসেবা ছিল অনন্য এক বৈশিষ্ট্য। প্রথম ওহি নাজিলের পর যখন তিনি আতঙ্কিত ছিলেন, তখন খাদিজা (রা.) তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমানিত করবেন না, কারণ আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অসহায়-দুর্বলের দায়িত্ব নেন এবং নিঃস্বকে সাহায্য করেন (বোখারি: ৩)। মানবকল্যাণমুখী কাজ বিপদাপদ ও অপমৃত্যু থেকে রক্ষা করে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় আয়ু বৃদ্ধি পায়। এমনকি বিবাদ মেটানো, সুন্দর কথা বলা, মসজিদে যাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ বা যেকোনো প্রাণীর সেবা করাও দান হিসেবে গণ্য হয় (বোখারি: ২৯৮৯, ২৩৬৩)।