ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধের শুরুতে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সংঘাত শেষ করার লক্ষ্য থাকলেও তা দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন কঠিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যস্থতায় একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতার সম্ভাবনা ট্রাম্পের জন্য নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন মূলত তিনটি পথ রয়েছে। প্রথমত, ইরান ও ওমানের সম্ভাব্য সমঝোতা মেনে নিয়ে হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের কিছু মাত্রার নিয়ন্ত্রণ স্বীকার করে নেওয়া। দ্বিতীয়ত, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়ে সংঘাত তীব্রতর করা। অথবা তৃতীয়ত, ইরানের বন্দর অবরোধ ও জাহাজ চলাচলে হামলার জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে বর্তমান অচলাবস্থা বজায় রাখা।
প্রথম পথটি বেছে নিলে হরমুজ প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে বড় ধরনের ছাড় দিতে হবে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চালান এই জলপথ দিয়ে প্রবাহিত হয়, যার ওপর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সাবেক মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ট্রাম্পের সামনে এখন ‘খারাপ বিকল্পের মেনু’ রয়েছে এবং এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। যদিও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে যে, কোনো অস্থায়ী নৌপথ চালু হলে সেখানে কোনো ধরনের বাধা থাকবে না এবং কোনো পক্ষ জাহাজ চলাচল তদারক করবে না। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও হরমুজ প্রণালিকে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে রাখার পক্ষে, যেখানে ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ বা টোল আরোপ মেনে নেওয়া হবে না। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্প রুবিওর অবস্থানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করায় হরমুজ ইস্যুতেও তিনি অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেন।
ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের বিমান হামলা চালানো ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়াতে পারে। নভেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া, জনসমর্থন কমে যাওয়া এবং যুদ্ধ নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তার জন্য ব্যয়বহুল হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন সামরিক চাপ প্রয়োগ করেও ইরানকে অবস্থান থেকে সরানো যায়নি। যদিও ট্রাম্প দাবি করছেন যে, ইরানের অনেক শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন এবং দেশটির সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবুও যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো এখনো অর্জিত হয়নি। শনিবার ট্রাম্প জানিয়েছেন, মিত্রদের অনুরোধে তিনি বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করে কূটনীতিকে সুযোগ দিতে চান, তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে কঠোর হামলার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। বুধবার লাস ভেগাসে এক সমাবেশে ট্রাম্প আবারও পরস্পরবিরোধী বার্তা দেন। তিনি বলেন, মানুষ হত্যা করতে চান না বলে তিনি একটি চুক্তি করতে বেশি আগ্রহী। তবে একই সঙ্গে হুমকি দেন, একপর্যায়ে সামরিক পদক্ষেপ নিতেই হবে।
এদিকে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালালে তাদের জ্বালানি অবকাঠামো পাল্টা হামলার লক্ষ্যবস্তু হবে। সংশ্লিষ্ট আলোচনার সঙ্গে পরিচিত পাঁচটি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে। হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হওয়াকে আলোচনা শুরুর অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, প্রণালিটি খুলতে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, তবে ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন এখনো অনেক বিষয় নিষ্পত্তি বাকি। গত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি দ্রুত ভেঙে পড়ায় চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রশাসন ধরে নিয়েছে নভেম্বরের নির্বাচনের সময়ও সংঘাত অব্যাহত থাকতে পারে, যা ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে অর্থনীতি ও নাগরিকদের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জোনাথন প্যানিকফের মতে, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া এই যুদ্ধ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে শিক্ষা নিচ্ছে। কট্টর ইরানবিরোধী সমর্থক বেহনাম বেন তালেব্লু সতর্ক করেছেন যে, ইরান ট্রাম্পকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলতে চাইছে যেখানে যেকোনো সিদ্ধান্তই তার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। সব মিলিয়ে, যুদ্ধ বন্ধ করতে চাইলে ট্রাম্পকে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে, অন্যথায় যুদ্ধ বাড়ালে তা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও রাজনৈতিক চাপের ঝুঁকি তৈরি করবে।

