প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে হওয়া দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন এবং দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্য নিয়ে ঢাকা সফরে এসেছেন চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং। মঙ্গলবার রাতে তিনি ঢাকায় পৌঁছান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গেও লিউ হাইসিংয়ের বৈঠক করার কথা রয়েছে। একই দিন দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে চীন-বাংলাদেশ রাজনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন তিনি।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর বেইজিং থেকে আসা প্রথম জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা লিউ হাইসিং। ওই সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এর মধ্যে বিএনপি ও সিপিসির মধ্যে সহযোগিতার বিষয়টি ছিল অন্যতম। এই সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো সেই সমঝোতাগুলো কার্যকর করার পথ সুগম করা।
সফরের সময় বিশেষ গুরুত্ব পাবে দুই দলের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, প্রতিনিধিদল বিনিময়, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ভাগ করে নেওয়া এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এছাড়া বাংলাদেশ–চায়না সেন্টার ফর পার্টি অ্যান্ড স্টেট গভর্ন্যান্স স্টাডিজ নামে একটি নতুন কেন্দ্রের উদ্বোধনেরও পরিকল্পনা রয়েছে, যা দুই দেশের রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সুশাসন ও উন্নয়নমূলক অভিজ্ঞতা বিনিময়ে সহায়ক হবে। এই কেন্দ্রের মাধ্যমে দুই দেশের রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সরকার পরিচালনা, উন্নয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং সুশাসনবিষয়ক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ সময় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে নানা বিষয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়। সীমান্ত, বাণিজ্য, পানিবণ্টন, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং প্রত্যর্পণ প্রশ্ন দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলে।
সফরের সূচিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিস্থল পরিদর্শনের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা বেইজিং ও বিএনপির মধ্যকার সম্পর্কের গুরুত্বকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরছে। গত জুনে সি চিন পিং ও তারেক রহমানের যৌথ ইশতেহারে দুই দেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশে চীনের দলীয় কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। বেইজিং এখন শুধু সরকার নয়, বরং বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বিভিন্ন ইসলামি দলের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগের পরিসর বিস্তৃত করেছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের আগস্টে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে বৈঠক করেন। আওয়ামী লীগের বাধার কারণে বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে গত এক দশকে যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কয়েকটি ইসলামি দলের নেতারা চীন সফর করেন।
এছাড়া ২০২৫ সালের এপ্রিলে নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে এনসিপির একটি প্রতিনিধিদল সিপিসির আন্তর্জাতিক বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশের সংস্কার ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করেন। জুলাই মাসে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উল্লেখ করেন যে, চীন সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী, যা বিগত দশকের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেয়।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে চীনের যোগাযোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। ২০১৬ সালে সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক কৌশলগত সহযোগিতার অংশীদারত্বে উন্নীত হয়েছিল। ২০১৯ সালের মার্চে আওয়ামী লীগ ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এমনকি ২০২৪ সালের মে মাসেও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের প্রতিনিধিদল চীন সফর করেছিল। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তনের পর চীনের দলীয় কূটনীতিতেও নতুন তৎপরতা দেখা যায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গেও বেইজিংয়ের সক্রিয় যোগাযোগ বজায় রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে চীনের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং ২০২৫ সালের মার্চে তাঁর চীন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক সম্পর্কের ধারাবাহিকতাকেই স্পষ্ট করে। ওই আলোচনায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় চীনের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখতে বেইজিং বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে মিয়ানমারের সংঘাত, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নিরাপত্তার বিষয়েও বাংলাদেশের জন্য চীনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রমশক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
লিউ হাইসিংয়ের এবারের সফরে রাজনৈতিক আলোচনার বাইরেও বাংলাদেশের শিল্পায়ন, জ্বালানি খাত, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি সুবিধা বাড়ানোর মতো অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার বিষয়গুলোও প্রাধান্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিদ্যুৎ খাতে চীনের বড় ধরনের সম্পৃক্ততা এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মূলভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এসব সহযোগিতা বাস্তবায়নে বিনিয়োগের শর্ত, প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি হস্তান্তরের পরিধি এবং বাংলাদেশের রপ্তানি স্বার্থ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

