তহবিল সংকটে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা, বাড়ছে অস্বস্তি

তহবিল সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সামাল দিতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটির প্রধান বারহাম সালিহ জানিয়েছেন, তাদেরকে এখন কার্যত অসম্ভব সব কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। বাজেট কাটছাঁটের জেরে ইউএনএইচসিআর তাদের কর্মী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। অথচ ঠিক এই সময়ই জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ইতিহাসের প্রায় রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে।

বারহাম সালিহ বলেন, যখন এই সহায়তা টিকিয়ে রাখার জন্য সম্পদ সবচেয়ে কম পাওয়া যাচ্ছে, ঠিক তখনই শরণার্থী সহায়তা সংস্থার কাছে প্রত্যাশা আরও অনেক বেশি। গত ৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাদের তহবিলে জমা ছিল ৩ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত ৮.৫ বিলিয়ন ডলার চাহিদার মাত্র ৩৫ শতাংশ। এছাড়া ইউএনএইচসিআর ২০২৭ সালের জন্য আনুমানিক ২.৬৮ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে।

সালিহ জানান, চলতি বছর ইউএনএইচসিআর ১৮টি দেশে ২২টি জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণায় সাড়া দিয়েছে, যার মধ্যে ১৫টি দেশে ১৭টি নতুন জরুরি পরিস্থিতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বাজেট চাপের বিষয়টি বুঝতে পারলেও কম খরচে বেশি কাজ করা এবং অসম্ভব কাজ করতে চাওয়ার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। কর্মী সংকটের বিষয়ে তিনি জানান, ২০২৪ সাল থেকে প্রায় ৮ হাজার কর্মী ইউএনএইচসিআর ছেড়ে চলে গেছেন। এর ফলে সংস্থার মোট কর্মী সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার থেকে কমে বর্তমানে ১২ হাজারের কিছু নিচে নেমে এসেছে। অভিজ্ঞ এই কর্মীদের হঠাৎ চলে যাওয়ার ফলে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়।

বংশানুক্রমিক বাস্তুচ্যুতির চিত্র তুলে ধরে ইউএনএইচসিআর জানায়, ২০২৫ সালের শেষে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন, যা ২০২৪ সালের ১২ কোটি ৩২ লাখের রেকর্ড থেকে কিছুটা কম। এই বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে ৩ কোটি ৫৬ লাখ মানুষ ইউএনএইচসিআর-এর ম্যান্ডেটের অধীনে থাকা শরণার্থী ছিলেন। যাদের দুই-তৃতীয়াংশই এসেছেন ভেনেজুয়েলা, ইউক্রেন, সিরিয়া, আফগানিস্তান এবং সুদান থেকে।

ঐতিহ্যগতভাবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ দাতা দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে তাদের বৈদেশিক সাহায্য ব্যাপকহারে ছাঁটাই করেছে। পাশাপাশি অন্যান্য প্রধান দাতারাও নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। ২০২৬ সালে স্বেচ্ছাসেবী অনুদান হিসেবে পাওয়া ২.৪৪ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছিল ইউএনএইচসিআর-এর শীর্ষ দাতা, যাদের অবদান ছিল ৪০৮ মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল নবম বৃহত্তম অবদানকারী দেশ, যারা মাত্র ৮৯ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে যা গত বছরের ৮১২ মিলিয়ন ডলার থেকে অনেক কম। এছাড়া চীন অনুদান দিয়েছে ১.৮ মিলিয়ন ডলার, যা ফিলিপাইনের বেসরকারি দাতাদের অনুদানের চেয়েও কিছুটা কম।

বারহাম সালিহ আরও উল্লেখ করেন, শরণার্থীদের জন্য যে সংকট প্রায়শই একটি সাময়িক সমাধান হিসেবে শুরু হয়, তা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী রূপ নেয়। বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশুরা সেখানেই বড় হয় এবং নিজেদের সন্তান জন্ম দেয়। এমন একটি ভবিষ্যতের দিকে কাজ করতে হবে যেখানে এক প্রজন্মের শরণার্থীদের বাস্তুচ্যুতির অভিশাপ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হতে না হয়।