জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক আবহাওয়াগত অস্থিরতার কারণে দেশের স্বাভাবিক ঋতুচক্র ক্রমে ভেঙে পড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে তীব্র তাপপ্রবাহ অনুভূত হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা তাপমাত্রা বাড়িয়ে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করবে।
প্রশান্ত মহাসাগরের আবহাওয়াগত পরিবর্তন ‘এল নিনো’র প্রভাবে আগামী মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে তীব্র দাবদাহ ও চরম আবহাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটি জানিয়েছে, এবারের এল নিনো মাঝারি থেকে প্রবল শক্তিশালী হতে পারে, যা বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে। মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া সাধারণত ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো সতর্ক করে বলেছেন, শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, কারণ এটি একদিকে খরা ও তীব্র দাবদাহ সৃষ্টি করে, অন্যদিকে অতিবৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়ায়। জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বের অধিকাংশ স্থানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা অনুভূত হতে পারে এবং এই পরিস্থিতি নভেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ আমেরিকা, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ায় অতিবৃষ্টি হলেও অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় খরার প্রকোপ বাড়তে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশেও।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট অ্যাকশন ল্যাবের গত এপ্রিলে প্রকাশিত ‘অ্যাডাপটেশন রোডম্যাপ’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত ২৪ জনের মৃত্যু ঘটতে পারে। তাপজনিত মৃত্যুহারের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ২৫টি দেশের তালিকায় রয়েছে। প্রতিবেদনে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজনকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় নগরী খুলনায় প্রতি এক লাখে ৩৬ জনের মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে, যা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া রাজধানী ঢাকায় এই হার ২২ এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ১২ জন।
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক কামরুজ্জামান মনে করেন, বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো আবহাওয়াগত ঘটনা নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সংকটের বহিঃপ্রকাশ। তার মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বনভূমি ধ্বংসের ফলে পরিবেশের ব্যাপক অবক্ষয় ঘটছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, নগর এলাকাগুলোতে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে, যার ফলে ঢাকা, রাজশাহী বা খুলনার মতো বড় শহরগুলোতে তাপমাত্রা আশপাশের অঞ্চলের তুলনায় কয়েক ডিগ্রি বেশি অনুভূত হচ্ছে। চাকরির আরও তথ্য: বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জনস্বাস্থ্য, কৃষি উৎপাদন এবং অর্থনৈতিক চাপ। চাকরির আরও তথ্য: তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও মৃত্যুহারের এই গবেষণা দেখিয়েছে, মানুষের জীবন রক্ষায় লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। চাকরির আরও তথ্য: এটি একটি ধারাবাহিক গবেষণার প্রথম অংশ, যেখানে কোথায় এবং কী ধরনের জলবায়ু অভিযোজন বিনিয়োগ সবচেয়ে কার্যকর হবে তা চিহ্নিত করা হয়েছে।

