নেতানিয়াহুর ভাষণে জাতিসংঘে তোলপাড়, ওয়াকআউট ও তীব্র বিক্ষোভ

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিতে মঞ্চে ওঠার পরপরই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিদের একাংশ ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে নেতানিয়াহু মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় কক্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দুয়ো ধ্বনি ওঠে। পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে অধিবেশন সভাপতি বারবার শান্ত থাকার অনুরোধ জানান। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে নেতানিয়াহু চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, ‘নৈতিকভাবে কাপুরুষ যেসব ব্যক্তি এখনো এই কক্ষ থেকে বের হয়ে যাননি, দয়া করে বের হয়ে যান।’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অধিবেশনের সভাপতি বারবার সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। এর ফলে নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক সফরের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।

এএফপির তথ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের পক্ষ থেকে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে এই ভাষণ যৌথভাবে বয়কট ও ওয়াকআউট করার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হয়েছিল। অধিবেশনস্থলের বাইরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের অদূরে ফার্স্ট অ্যাভিনিউতে শত শত বিক্ষোভকারী সমবেত হয়ে রাস্তা বন্ধ করে দেন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে সেখান থেকে পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে। ভাষণের এক পর্যায়ে নেতানিয়াহু দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশকে রক্ষা করে যাব। আমাদের আর কোনো পথ নেই, তাই আমরা জয়ী হবই।’ তিনি এ সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বর্বরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বড় বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেন, যদিও এই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কোনো বৈঠকের কর্মসূচি ছিল না। তাঁদের অনেকে সড়কে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। বিক্ষোভকারীরা ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করুন, গাজাকে বাঁচতে দিন’ এবং ‘ইসরায়েলকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করুন, ইরানকে বাঁচতে দিন’—এ ধরনের স্লোগান দেন। ভাষণে অবশ্য ট্রাম্পের প্রশংসা করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক চাপের মুখে থাকা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে কঠোর ভাষায় বিভিন্ন দেশের সমালোচনা করেন। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহু, তাঁর তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং হামাসের তৎকালীন সামরিক কমান্ডারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এসব পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে নেতানিয়াহু বলেন, বিশ্বনেতারা ‘ইহুদিবিদ্বেষী জনতার কাছে নতিস্বীকার’ করে ‘দুর্বলতা’ ও ‘তোষণের’ নীতি গ্রহণ করছেন। তিনি বিশেষ করে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের বর্তমান অবস্থানের সমালোচনা করেন। ভাষণের আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ পশ্চিম তীরে হামাস সক্রিয় নয় বলে মন্তব্য করেছিলেন, যার রেশ ধরে নেতানিয়াহু সরব হন। তবে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদল দাঁড়িয়ে তালি দিয়ে নেতানিয়াহুকে স্বাগত জানায়। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপও বেড়েছে।

ইরান ইস্যুতেও নেতানিয়াহুর বক্তব্য ছিল অত্যন্ত আক্রমণাত্মক। তিনি ইরানের সরকারকে ‘খুনে স্বৈরশাসন’ হিসেবে অভিহিত করে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন থেকে দেশটিকে বিরত রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। নেতানিয়াহু দাবি করেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের পতন খুব বেশি দূরে নয়। এ সময় তিনি জাতিসংঘে ইরানের প্রতিনিধির খালি ডেস্কে নিহত কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির ছবি রাখার বিষয়টিও উল্লেখ করেন। প্রসঙ্গত, চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের প্রতিবাদে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। এ ধরনের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মাঝেই নেতানিয়াহু তাঁর কঠোর অবস্থান অটুট রাখার ঘোষণা দিলেন। তাঁর সাহসী নেতৃত্বের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ।’।