ফিলিস্তিনি ক্রীড়া ভাষ্যকার খলিল জাদাল্লাহ গত তিন বছর ধরে গাজা যুদ্ধে নিহত অগণিত অ্যাথলেটের শোকে কাতর ছিলেন। দীর্ঘ বিরতির পর ফিলিস্তিনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ায় তার মাঠে ফেরাটা ছিল এক তিক্ত-মধুর অভিজ্ঞতা। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর ফিলিস্তিনের পেশাদার ক্রীড়াঙ্গন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছিল। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে ১,০১৪ জন অ্যাথলেট প্রাণ হারিয়েছেন। শুক্রবার পশ্চিম তীরের আল-রামের ফয়সাল আল হুসেইনি স্টেডিয়ামে আয়োজিত এই টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে ধারাভাষ্য দিতে গিয়ে জাদাল্লাহ তার অনুভূতির কথা জানান। তিনি বলেন, দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর মাঠে ফেরার আনন্দ যেমন আছে, তেমনি হারানোর বেদনাও তীব্র। তিনি আরও বলেন, আমরা খেলোয়াড়, ভক্ত, প্রশাসক এবং রেফারিদের হারিয়েছি।
‘১০০০ শহীদ কাপ’ ও জাতীয় সংহতি
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এই টুর্নামেন্টের নাম দিয়েছে ‘১০০০ শহীদ কাপ’। এতে পশ্চিম তীর, গাজা এবং লেবাননের শরণার্থী শিবিরের ২০০টিরও বেশি দল অংশ নিচ্ছে। যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে ফিলিস্তিনি ফুটবল কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফুটবল খেলোয়াড়দের হত্যা এবং গাজার ক্রীড়া অবকাঠামো ধ্বংসের অভিযোগ এনেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল দাবি করেছে যে, নিহত ১২ জন ফুটবল ব্যক্তিত্ব জঙ্গি গোষ্ঠীর সদস্য ছিলেন, যা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন প্রত্যাখ্যান করেছে। স্টেডিয়ামের বাইরে নিহত অ্যাথলেটদের নাম সম্বলিত একটি স্মৃতিফলক উন্মোচন করা হয়েছে, যা পশ্চিম তীরের বিভাজন প্রাচীরের কাছে অবস্থিত।
মাঠের পরিবেশ ও শোকের আবহ
ম্যাচ শুরুর আগে জাবাল আল মুকাবের ক্লাব এবং শাবাব আল খালিল এসসি-র খেলোয়াড়দের সামনে শিশুরা একটি ফিলিস্তিনি পতাকা নিয়ে আসে, যা মৃতদেহের আদলে মোড়ানো ছিল। পরে তা মাঠের কেন্দ্রে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। খেলার ১০ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের মাথায় রেফারি এক মিনিটের নীরবতা পালনের নির্দেশ দেন। স্টেডিয়ামের ইলেকট্রনিক স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘ফুটবল ফিলিস্তিনে ফিরে এসেছে’ বার্তাটি। আল-রামের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী মায়সান সুলেইমান বলেন, তিনি এখানে শহীদদের স্মরণ করতে এসেছেন। তিনি বলেন, আমি কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করছি না, বরং এই টুর্নামেন্টের ধারণাকে সমর্থন করছি। তারা সবাই ফিলিস্তিনের সন্তান।
গাজা ও লেবাননে টুর্নামেন্টের বিস্তার
- গাজাতেও একই সময়ে টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছে, যেখানে যুদ্ধের কারণে অনেক মাঠ এখন বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরে পরিণত হয়েছে।
- দেইর আল বালাহতে খাদামাত রাফাহ এবং শাবাব রাফাহর মধ্যে উদ্বোধনী ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দর্শকরা পাম গাছের নিচে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে খেলা উপভোগ করেন।
- খাদামাত রাফাহর খেলোয়াড় খলিল মাতার বলেন, যুদ্ধের আগে ফুটবল আমাদের কাছে জীবনের প্রতীক ছিল, কিন্তু যুদ্ধের পর খেলোয়াড়দের জীবন থমকে গেছে।
- মাতার আরও জানান, পশ্চিম তীর, গাজা এবং লেবাননের শরণার্থী শিবিরে একই সময়ে এই কাপ আয়োজন করা ফিলিস্তিনিদের ‘জাতীয় সংহতি’র বহিঃপ্রকাশ।
- শাবাব জাবা দলের আবদুল্লাহ আবু ঘাসান বলেন, সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমরা ক্রীড়া কার্যক্রম চালিয়ে যেতে এবং তরুণদের গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।
প্রবীণ কোচ সামির ইসা বলেন, রাজনীতির চেয়েও ফুটবল আজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার মতে, খেলাধুলা মানুষের সংস্কৃতির অংশ এবং ফিলিস্তিনিদের সব ধরনের খেলাধুলা স্বাভাবিকভাবে চর্চা করার অধিকার রয়েছে। তবে পশ্চিম তীরের দলগুলোর জন্য ইসরায়েলি সামরিক চেকপোস্ট পার হয়ে বিভিন্ন শহরে যাতায়াত করা একটি বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্টেডিয়ামে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন ছিল, যা এই এলাকায় একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য। হাজার হাজার তরুণ, পরিবার এবং নারী এই ম্যাচ দেখতে ভিড় করেন, যা ফিলিস্তিনিদের ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছার প্রতিফলন।

