দ্রুত নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান আবাসন সংকট মোকাবিলায় নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম জানিয়েছেন, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ছোট আকারের ফ্ল্যাট, সামাজিক আবাসন এবং ব্লকভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জমির সংকটের কারণে আবাসন সমস্যা এখন বহুমাত্রিক। এ অবস্থায় সবার জন্য উপযুক্ত আবাসন নিশ্চিত করা জরুরি। এর অংশ হিসেবে ব্লকভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থায় বেশি এফএআর (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) এবং বেশি সবুজ স্থান নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজউক চেয়ারম্যানের মতে, দ্রুত নগরায়ণের চাপে শহরগুলোয় জায়গার অভাব এবং নাগরিক সুবিধার অপর্যাপ্ততা প্রকট হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, আবাসন খাতে নিরাপত্তার বিষয়টিই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারযোগ্য। ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নকশা বহির্ভূত নির্মাণকাজে কঠোর অবস্থানে রয়েছে কর্তৃপক্ষ। ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় ত্রুটিপূর্ণ নকশা, মাটির অবস্থা ও নির্মাণ-অনিয়মকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করলে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশের নির্মাণ খাত। একই সঙ্গে নগর পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে আবাসন ও বাণিজ্যিক উন্নয়নকে সমন্বয় করতে ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) এবং পুনঃউন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ প্রসারে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জমির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ফ্ল্যাটভিত্তিক প্রকল্পের দিকে নজর দিচ্ছে রাজউক। উত্তরায় বি ও সি ব্লকে এই ধরনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আবাসনের সরবরাহ বাড়াতে ৬০০ বর্গফুট পর্যন্ত আয়তনের ছোট ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে ইউনিট সংখ্যার ওপর কোনো বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি।
টেকসই নগরায়ণ নিশ্চিত করতে পরিবেশবান্ধব ভবনের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইমারত বিধিমালা, ২০২৫ অনুযায়ী, এক বিঘা বা তার চেয়ে বড় আয়তনের প্লটে ন্যূনতম ১০ শতাংশ জমিতে গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া গ্রিন বিল্ডিং ধারণাকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ক্ষেত্রে পরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি ঐতিহাসিক স্থাপনা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের বিষয়টিকেও রাজউক সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজুল ইসলামের ভাষ্যমতে, টেকসই আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সরকারের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। এ জন্য ডেভেলপার, গবেষক, বিনিয়োগকারী এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
বর্তমানে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ সংশোধনসহ আবাসন খাতের নানাবিধ ইস্যুতে অংশীজনদের সাথে সংলাপ অব্যাহত রেখেছে রাজউক। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মনে করেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই আলোচনাগুলো অংশীজনদের মধ্যকার সংলাপকে আরও গতিশীল করবে।
রাজউকের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হলো এমন একটি পরিকল্পিত ঢাকা গড়ে তোলা, যেখানে নিরাপদ আবাসন এবং নাগরিক সুবিধা কেবল সমাজের উচ্চবিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সাধারণ মানুষের জন্যও এই সুবিধাগুলো সমানভাবে উন্মুক্ত থাকবে। রাজউকের দুর্বল উপস্থিতিকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

