সাভারের বিসিক ট্যানারি শিল্পনগরীর অব্যবহৃত কঠিন বর্জ্যকে সঠিক প্রযুক্তিতে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট (বিল্ড) ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, এই বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবহার করা গেলে বছরে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব। রাজধানীর একটি হোটেলে ‘ওয়াস্ট ইনটু রিসোর্স: ট্যানারি সলিড ওয়াস্ট বাই-প্রডাক্ট অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ মডেল’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে এই সম্ভাবনাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা বেগম। তিনি জানান, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৯০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১১ ধরনের পণ্য আমদানি করে। অথচ সাভারের ১৫০টি সচল ট্যানারি কারখানা থেকে বছরে প্রায় ৮৪ হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার মাধ্যমে এসব পণ্যের চাহিদার একটি বড় অংশ দেশেই পূরণ করা সম্ভব। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই বর্জ্যের প্রায় ৬৪ শতাংশই ক্রোমিয়ামমুক্ত। তবে বর্তমানে প্রয়োজনীয় পৃথক্করণ ও প্রক্রিয়াজাত ব্যবস্থার অভাবে এই বর্জ্যের প্রায় ৮৪ দশমিক ৩৯ শতাংশই অপচয় হয়ে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব স্মৃতি কর্মকার বলেন, চামড়া শিল্পের এই কঠিন বর্জ্যকে শুধু আবর্জনা হিসেবে না দেখে সঠিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নতুন ব্যবসা, বিনিয়োগ ও সবুজ উদ্যোক্তা তৈরির মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সরকার রফতানি বহুমুখীকরণ, নীতি সহজীকরণ, উন্নত বাজারে প্রবেশাধিকার এবং দেশীয় পণ্যের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে তিনি জানান।
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকলেও কাঁচামালের ঘাটতি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, বিনিয়োগকারীরা এই খাতে পুঁজি বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তীব্র সংকট তাদের বাধাগ্রস্ত করছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় মন্ত্রণালয়, সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও সহযোগিতা জরুরি বলে তিনি মত দেন।
ডিটিআইডব্লিউটিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ জানান, দেশে বছরে ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি ক্যাপসুলের একটি বড় অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে, যা পূরণে অবিলম্বে একটি সমন্বিত কঠিন বর্জ্যনীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাভারের কোনো কারখানাই এখন পর্যন্ত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন পায়নি। পরিস্থিতি উত্তরণে দ্রুত কেন্দ্রীয় সিইটিপি স্থাপন এবং এলডব্লিউজি সার্টিফিকেশনের জন্য একটি পাইলট প্রকল্প শুরুর দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি টিপু সুলতান সিইটিপি অকার্যকর হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এর ফলে আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান বর্জ্যের শ্রেণীবিন্যাস সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে ডেডিকেটেড প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
ইউনিডোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আলমগীর হোসেন বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে চামড়া শিল্পকে বিকল্প প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিসিকের পরিচালক (শিল্প উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) কাজী নজরুল ইসলাম কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অফিস, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি উৎস পর্যায়ে কাঁচামালের মানোন্নয়নের জন্য কসাইখানাগুলোকে সচল করার ওপর জোর দেন তিনি।
সংলাপে অন্যান্যদের মধ্যে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর ইশরাত শবনম, এশিয়া ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ প্রজেক্ট ম্যানেজার সাজ্জাদ হোসেন খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে এবং আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা দূর করতে আলোচনা করেন। পরিবেশগত ছাড়পত্র, পণ্যের মানসনদ ও আইনি স্বীকৃতির ঘাটতিগুলো দূর করে এই খাতকে একটি টেকসই শিল্পে রূপান্তরের আহ্বান জানানো হয়।

