সৌদি আরবে হুতি ক্ষেপণাস্ত্রের ভয়ে নির্ঘুম রিয়াদ প্রবাসীরা

সৌদি আরবের রিয়াদে হুতি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গত ১০ই অক্টোবর রাতে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ লক্ষ্য করে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকে প্রবাসীদের মাঝে মৃত্যুভয় জেঁকে বসেছে। এই হামলায় মোট ১২ জন নিহত ও ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি নিহত এবং ২৪ জন বাংলাদেশি আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহত দুই প্রবাসী হলেন বগুড়ার মো. শাহেদ আহম্মদ ও কুমিল্লার মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরী। তাদের মরদেহ দেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। আহতদের মধ্যে ১১ জন কর্মী এবং ১৩ জন ওমরাহ যাত্রী রয়েছেন। হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন আহত বাংলাদেশিরা: গত ১০ই অক্টোবর আনুমানিক রাত ৩টা ১৫ মিনিটে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩-এর উপর একটি ক্ষেপণাস্ত্র পড়ে। কখন মিসাইল এসে পড়ে- এই আতঙ্ক নিয়ে যাচ্ছেন কর্মক্ষেত্রে। প্রায় প্রতিদিনই ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায়।

প্রবাসীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পরপরই মোবাইলে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কবার্তা ভেসে আসে। এমন ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যেও জীবিকার তাগিদে তাদের কর্মক্ষেত্রে যেতে হচ্ছে। রিয়াদে অবস্থানরত নাজমুল ইসলাম জানান, প্রবাসীরা যখন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আতঙ্কে থাকেন, তখন দেশে থাকা তাদের পরিবারের সদস্যরা থাকেন তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। কাজ করতে গিয়ে সবসময় মাথার ওপর হামলা হওয়ার ভয় কাজ করে। মাঝেমধ্যে হামলার কোনো আগাম নির্দেশনা পাওয়া যায় না, শুধুমাত্র যখন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে তখন সতর্কবার্তার নোটিফিকেশন আসে, যা প্রবাসীদের জন্য কোনো কার্যকর সমাধান নয় বলে তারা মনে করছেন। দিনের মধ্যে আট-দশবারই এমন আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয় সবাইকে।

আরিফুল ইসলাম নামের আরেক প্রবাসী জানান, আতঙ্ক থাকা সত্ত্বেও জীবিকার জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। রিয়াদের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, এই পরিস্থিতির মধ্যে দিন পার করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এছাড়া ইকামার উচ্চ খরচ ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেকেরই দেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নোয়াখালীর এক প্রবাসী আক্ষেপ করে জানান, যারা সরাসরি এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হননি, তাদের পক্ষে এই অস্থিরতা ও মানসিক চাপ বোঝা সম্ভব নয়। এর প্রভাব পড়েছে প্রবাসীদের স্বজনদের ওপরও, যারা প্রিয়জনের জীবন নিয়ে প্রতিনিয়ত উৎকণ্ঠায় কাটাচ্ছেন। পরিবার ও স্বজনদের জীবিকার কথা চিন্তা করে ফিরতে পারছেন না দেশে। সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নোয়াখালীর অনেক প্রবাসীও আমার সঙ্গে একই কারখানায় কাজ করছেন।

বর্তমানে আহত ২৪ জন বাংলাদেশি রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। কিং আব্দুল্লাহ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনজনের অবস্থা স্থিতিশীল থাকলেও তারা আইসিইউতে রয়েছেন। তাদের নাম হাফেজ হাসান (ঢাকা), কাজী নুরুল্লাহ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) ও মো. ওমর ফারুক। এছাড়া ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালে সাফকাত রহমান ও মো. দাউদুল ইসলাম; রিয়াদ মেডিকেল হাসপাতালে মো. সাইমুল ইসলাম সৌরভ ও আবুল মনসুর মো. রিয়াজ উদ্দীন; প্রিন্স সুলতান মিলিটারি হাসপাতালে মো. আব্দুল্লাহ; সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের তাখাসসুসি শাখায় আরমান হোসেনসহ তিন বাংলাদেশি কর্মী; কিংডম হাসপাতালে মো. রফিক মিয়া এবং কিং খালেদ মেডিকেল সিটিতে ইসমাইল হোসাইন, মো. মিসবাহ উদ্দিন হীরক ও মো. রায়হানুল ইসলাম চিকিৎসাধীন আছেন।

আহতদের মধ্যে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ হাসপাতালে পাঁচজন, এজতাহ সনদ হাসপাতালে দুইজন, সুলাইমান ফকিহ হাসপাতালে একজন এবং সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের আলসাহাফা শাখায় আরও দুইজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। হামলার পর ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন এবং ঢাকা থেকে সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিল হওয়ার কারণে প্রবাসীদের দেশে ফেরা ও কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার ভোগান্তি বেড়েছে। অনেক প্রবাসী এখন বিকল্প পথ কিংবা কোম্পানির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন।