চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকের বাজারে চীন প্রায় ২ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বাজার হারিয়েছে। তবে চীনের এই হারানো বাজারের বড় অংশ বাংলাদেশ নিতে পারেনি। বরং ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগীরা তাদের রপ্তানি বাড়িয়ে এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মোট ৩ হাজার ৫০৯ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ কম। সামগ্রিক আমদানি কমলেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে চীন, ভারত, মেক্সিকো, পাকিস্তান ও হন্ডুরাস থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি হ্রাস পেয়েছে।
তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, গত বছর পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের চাহিদা কমছে। চীনের ক্রয়াদেশ দ্রুত কমলেও তার বড় অংশ ভিয়েতনামে চলে যাচ্ছে। কিছু ক্রয়াদেশ ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া পাচ্ছে। বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে মূল কারণ হলো চীন থেকে সরে আসা ক্রয়াদেশের বড় অংশই কৃত্রিম তন্তুর বা ম্যানমেইড পোশাক, যেখানে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলনামূলক কম। পাশাপাশি দীর্ঘ লিড টাইমের কারণে ফাস্ট ফ্যাশনের ক্রয়াদেশেও বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকছে।
বাংলাদেশি পোশাকের একক বৃহত্তম বাজার যুক্তরাষ্ট্র। গত ফেব্রুয়ারিতে এই বাজারে চীনকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশের অবস্থানে উঠে এসেছিল। জুন শেষে সেই অবস্থান ধরে রাখলেও জানুয়ারি-জুন সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৪০১ কোটি ডলারের পোশাক, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, তুলাবিহীন বা নন-কটন পোশাকে বাংলাদেশের দক্ষতা কিছুটা কম, ফলে ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ বাংলাদেশ নয়। এ ছাড়া ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া প্রায় এক মাসের লিড টাইমে পণ্য সরবরাহ করতে পারে। সোর্সিং এবং লজিস্টিকসের দুর্বলতার কারণেই বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে বলে তিনি মনে করেন। তবে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ বেড়ে ৮২০ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল।
করোনার আগে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই চীনের রপ্তানি কমছিল, যা গত বছর পাল্টা শুল্ক আরোপের ফলে আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। এরপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগ করে সব দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীন যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫৭ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ কম। বিপরীতে, ভিয়েতনাম ৭৮৫ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যার প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়া ২৩৩ কোটি ডলার ও কম্বোডিয়া ২১৩ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যাদের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৩ ও ১২ শতাংশ।
তবে উদ্যোক্তারা সামনে ভালো করার সম্ভাবনা দেখছেন। আইন অনুযায়ী ১৫০ দিনের জন্য এ শুল্ক আরোপ করা যায়, যার মেয়াদ গত মাসে শেষ হয়েছে। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর না করার অভিযোগে গত মাসে বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর ১০ ও সাড়ে ১২ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে বাংলাদেশের শুল্কহার প্রতিযোগী কয়েকটি দেশের তুলনায় কম। স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, বর্তমানে আড়াই শতাংশ শুল্ক-সুবিধা থাকায় বছরের প্রথমার্ধে খারাপ করলেও সামনে ভালো করার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যে মার্কিন ক্রেতা প্রতিষ্ঠান থেকে দুটি বড় ক্রয়াদেশ পাওয়া গেছে যা ভিয়েতনাম থেকে সরে এসেছে। তবে তিনি জ্বালানিসংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, যা উৎপাদন ব্যাহত করছে এবং বিদেশি ক্রেতাদের চিন্তিত করে তুলছে।
গত বছরের প্রথমার্ধে দেশটি রপ্তানি করেছিল ৫৭৩ কোটি ডলারের পণ্য।
অর্থাৎ এক বছরে চীনের রপ্তানি কমেছে ২১৬ কোটি ডলার।চীনের হারানো বাজারের বড় অংশ পাচ্ছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়া।

