ইতালিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ইতালিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি অংশের ক্রমবর্ধমান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। আইন অমান্য ও বিশৃঙ্খলা তৈরির ফলে সেখানে বসবাসরত সাধারণ ও নিরপরাধ বাংলাদেশিরা বর্তমানে চরম আতঙ্ক ও হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে গত ৪৬ বছর ধরে ইতালিতে বাংলাদেশিরা যে ইতিবাচক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন, তা এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

ইতালিতে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার নামে একাধিক আঞ্চলিক সমিতি সক্রিয় থাকলেও, এদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সংগঠনের অধিকাংশ কমিটি কেবল পদের আশায় গঠিত হয় এবং প্রবাসীদের কল্যাণে এদের কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই। অধিকাংশ সমিতির কার্যক্রম কেবল বার্ষিক পিকনিকের মতো আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সম্প্রতি ট্রিপল মার্ডার, কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বনি আমিনের ওপর হামলা এবং শিল্পী সালমা আক্তারের অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলার মতো ঘটনা ঘটলেও, কমিউনিটি সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে অপরাধ প্রতিরোধে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।

গত ২৬ জুন ইতালি প্রবাসী শাহাদাত হোসেনের হাতে এক দম্পতি ও তাদের শিশুকন্যা নির্মমভাবে প্রাণ হারান। এই ট্রিপল মার্ডারের মূল অভিযুক্ত শাহাদাত ঘটনার পর থেকেই পলাতক রয়েছেন এবং ইতালীয় পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। পুলিশ তার ছবিসহ তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে। স্থানীয় প্রশাসনের ধারণা, অভিযুক্তকে লুকিয়ে থাকতে কমিউনিটিরই কেউ সহযোগিতা করছেন, যা নিয়ে ইতালীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। গত ১১ আগস্ট নিহতদের জানাজায় বিপুল সংখ্যক ইতালীয় নাগরিক উপস্থিত হয়ে সমবেদনা জানালেও, বাংলাদেশিদের উপস্থিতি ছিল হতাশাজনকভাবে কম। এক প্রবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এমন ট্র্যাজেডিতে কমিউনিটির এমন উদাসীনতা তাদের ভঙ্গুর অবস্থাকেই ফুটিয়ে তোলে।

ট্রিপল মার্ডারের রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২১ জুলাই রাতে রোমের বাংলাদেশি অধ্যুষিত তরপিনাত্তারা এলাকায় অস্ট্রেলীয় প্রবাসী ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটর বনি আমিনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। রাজনৈতিক মতাদর্শগত কারণে পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। বিষয়টি বর্তমানে ইতালীয় পুলিশের তদন্তাধীন রয়েছে এবং পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছে। বনি আমিন জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠক হয়েছে এবং বিস্তারিত ভিডিও ফুটেজ শিগগিরই সামনে আনা হবে।

এ বিষয়ে কলামিস্ট ও সাংবাদিক পলাশ রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশিরা যে সুনাম অর্জন করেছিল, তা আজ ট্রিপল মার্ডার, হামলা এবং অর্থ ও ডকুমেন্ট জালিয়াতির মতো ঘটনায় ম্লান হতে বসেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এর নেতিবাচক প্রভাব ইতালির শ্রমবাজারে পড়তে পারে এবং নিয়োগকর্তারা সৎ প্রবাসীদেরও সন্দেহের চোখে দেখতে পারেন। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলার মিশনকে স্থানীয় সংগঠনগুলোকে সাথে নিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

ইতালি বিএনপির সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক সোহাগ খান বলেন, প্রবাসে কোনো বিদেশি পর্যটক বা প্রবাসী হামলার শিকার হবেন কিংবা খুনের মতো ঘটনা ঘটবে—তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ভিন্ন মত থাকলেও তা যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়। ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে প্রবাসে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মুষ্টিমেয় কিছু অপরাধীর কর্মকাণ্ডের কারণে ইতালীয় সমাজে সাধারণ বাংলাদেশিদের অবমূল্যায়ন ও হীন চোখে দেখা হচ্ছে বলে মনে করছেন প্রবাসীরা। এই সংকট নিরসনে তারা বাংলাদেশ দূতাবাস ও রোমের স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। এদিকে, ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও মূল অভিযুক্ত শাহাদাত হোসেনকে গ্রেফতার করতে না পারায় স্থানীয় প্রশাসনের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হচ্ছে যে, বাংলা কমিউনিটির কেউ তাকে আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করছেন।

এসব ঘটনার বিষয়ে ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এটিএম রফিকুল হকের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।

প্রবাসীদের মতে, এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে ইতালিতে বাংলাদেশিদের প্রায় ৪৬ বছরের অর্জিত ইতিবাচক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

ট্রিপল মার্ডার ও জানাজায় উপচে পড়া ইতালীয়, বাংলাদেশিরা অনুপস্থিত গত ২৬ জুন ইতালি প্রবাসী শাহাদাত হোসেন নামে এক বাংলাদেশির হাতে স্বামী, স্ত্রী ও এক শিশুকন্যা নির্মমভাবে খুন হন।

গত ১১ আগস্ট নিহত কামালের পরিবারের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এক প্রবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সব জায়গায় ব্যক্তিগত স্বার্থ দেখলে চলে না।

সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত