ইসরায়েলে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি দেখছে সিআইএ-এর গোপন মূল্যায়ন

রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে ইসরায়েল বর্তমানে গৃহযুদ্ধ বা অভ্যন্তরীণ ধসের মতো চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর একটি গোপন মূল্যায়নে এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। ‘ফ্র্যাকচার ফ্রম উইদিন’ বা ‘ভেতর থেকে ভাঙন’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনটি গত আগস্ট মাসে সিআইএ-এর বিকল্প বিশ্লেষণকারী বিশেষ দল ‘রেড সেল’ প্রস্তুত করেছিল। প্রতিবেদনটিতে আগামী ২৭ অক্টোবরের জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির বিষয়টি উঠে এসেছে, যা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সংস্থাটির এই আধা-স্বাধীন ইউনিট মূলধারার গোয়েন্দা বিশ্লেষণের বাইরে গিয়ে বিকল্প পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং প্রচলিত ধারণা ও পক্ষপাতকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য কাজ করে।

এই অভ্যন্তরীণ বিভাজনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে আল্ট্রা-অর্থোডক্স ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা থেকে দীর্ঘদিনের অব্যাহতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সামরিক অভিযানের কারণে বিপুলসংখ্যক রিজার্ভ সেনাকে কাজে ফিরতে হলেও, ইয়েশিভায় ধর্মীয় শিক্ষায় নিয়োজিত থাকার অজুহাতে আল্ট্রা-অর্থোডক্স পুরুষদের একাংশ নিয়মিত বাহিনীতে যোগ দেওয়া থেকে অব্যাহতি পান। এই বিতর্কিত ব্যবস্থা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের বিষয়ে আইন প্রণয়নে নেতানিয়াহুর জোট সরকার বারবার ব্যর্থ হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে এবং পরিষেবা এড়ানোর অভিযোগে বহু তরুণকে আটক করা হয়েছে।

নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) ও শাস পার্টির মতো শরিক দলগুলো এই বিক্ষোভকে সমর্থন দিয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর ডানপন্থী জোটের মধ্যকার গভীর ফাটলকে উন্মোচিত করেছে। ফলে সরকারে এই দলগুলোর সমর্থন বজায় থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিআইএ-এর মূল্যায়নে যুদ্ধ শেষে সশস্ত্র সেনা ও রিজার্ভ সদস্যদের বেসামরিক জীবনে ফিরে আসার বিষয়টিকেও একটি সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা বা সহিংসতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, বিশেষ করে যেখানে রিজার্ভ সেনারা বাড়িতে অস্ত্র রাখার সুবিধা ভোগ করেন। দল দুটি ১৯৯৬ সালে নেতানিয়াহু প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তাঁর অন্যতম নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। এই বিরোধ নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের ভেতরের বিভাজনও স্পষ্ট করেছে। একই সঙ্গে ইউটিজে ও শাসের সমর্থন তিনি ধরে রাখতে পারবেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ইসরায়েলে রিজার্ভ সেনারা বাড়িতে অস্ত্র রাখতে পারেন এবং প্রকাশ্যে অ্যাসল্ট রাইফেল বহনের ঘটনাও সেখানে অস্বাভাবিক নয়।

দেশটির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার তালিকায় পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বৃদ্ধি, খাদ্যদ্রব্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সামরিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক চাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অচলাবস্থার পূর্বাভাস দিয়েছে সিআইএ। জনমত জরিপ অনুযায়ী, নেতানিয়াহু কিংবা বিরোধী জোট কারো পক্ষেই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাওয়া নিশ্চিত নয়।

মূল্যায়নে একটি সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস, এআই প্রযুক্তি খাতের বিনিয়োগ কমে যাওয়া এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কের টানাপোড়েন বা স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। তবে মিডল ইস্ট আইয়ের মতে, ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বিদ্যমান উত্তেজনা, অসন্তোষ ও বৈষম্যের বিষয়টি এই মূল্যায়নে পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। সোমবার প্রকাশিত ড্রপ সাইট নিউজের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে মিডল ইস্ট আই।

এদিকে, আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নানা আইনি নাটকীয়তা অব্যাহত রয়েছে। গত শুক্রবার ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট প্রার্থিতা বাতিলের ইঙ্গিত দিলে এক ফিলিস্তিনি রাজনীতিক নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে একই সময়ে আদালত ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী চারটি রাজনৈতিক দলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।