পটুয়াখালীতে বন জবরদখল: দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চায়

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সরকারি সম্পদ সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তার বিপরীতে মাঠপর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। পটুয়াখালীর গলাচিপায় বন বিভাগের প্রায় ১০ থেকে ১১ বছরের পুরোনো ম্যানগ্রোভ বন কেটে ২০০ একরের বেশি জমি জবরদখলের ঘটনা কেবল অরাজকতার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি উপকূলের সুরক্ষাব্যবস্থার জন্য বড় হুমকি। স্থানীয় বিএনপি নেত্রীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে এক্সক্যাভেটর দিয়ে মাটি কেটে বাঁধ তৈরির যে অভিযোগ উঠেছে, তা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে অপরাধ করার পুরোনো অপসংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি। পটুয়াখালীর গলাচিপায় বন বিভাগের প্রায় ১০ থেকে ১১ বছরের পুরোনো ম্যানগ্রোভ বন কেটে প্রায় ২০০ একর জমি দখলের ঘটনা কেবল চরম অরাজকতাই প্রকাশ করে না, বরং দক্ষিণ উপকূলের সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট চাবুক হানে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সমাজে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি সম্পদ রক্ষার নতুন প্রত্যাশা তৈরি হলেও মাঠপর্যায়ে দলীয় পরিচয়ের আড়ালে ক্ষমতার অপব্যবহারের যে চিত্র ফুটে উঠছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

চরবিশ্বাসের ওই বনাঞ্চলে কেওড়া, শৈলা, গেওয়া ও বাইনগাছ ধ্বংস করে তরমুজ চাষের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে ও বাণিজ্যিক লাভের আশায় আনুমানিক ১০ লাখ টাকা মূল্যের পাঁচ শতাধিক গাছ উজাড় করে মাটি কাটা হয়েছে। এই ম্যানগ্রোভ বনগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। এমন গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সুরক্ষা বলয় ধ্বংস করার মাধ্যমে এলাকাটিকে দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। গলাচিপার চরবিশ্বাসে যে বিপুল বনাঞ্চল ধ্বংস করে তরমুজখেত প্রস্তুত করার চেষ্টা চলছে, তার সুদূরপ্রসারী ক্ষতি অপূরণীয়।

এই ঘটনায় প্রশাসনিক ও আইনি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বন বিভাগ ও সরকারি কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বাধা দিতে গেলে তাদের প্রকাশ্যে লাঞ্ছিত ও হুমকি দেওয়া হয়। অথচ এমন গুরুতর অপরাধের পরও আইনানুগ মামলা না করে দায়সারাভাবে শুধু সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। প্রভাবশালীদের প্রতি প্রশাসনের এমন নমনীয় অবস্থান অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করার শামিল। আইনের চোখে অপরাধী তার রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমান বিচার পাওয়ার যোগ্য।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় বন সংরক্ষণ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অবিলম্বে গলাচিপার এই বনাঞ্চল দখল ও নিধন পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে এবং বেদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধারে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে কোনো নেতা বা তাঁর আত্মীয় সরকারি সম্পদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের সাহস না পান। পরিবেশ বিধ্বংসী এই দৌরাত্ম্য এখনই রুখতে না পারলে উপকূলে দুর্যোগের ভয়াবহতা মোকাবিলা করা অদূর ভবিষ্যতে আরও কঠিন হয়ে পড়বে।