বিবাহিত জীবনের এক আনন্দঘন ও সংবেদনশীল পর্যায় হলো গর্ভাবস্থা। এই সময়ে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্ক ও সহবাস নিয়ে সমাজে নানা ধরনের ভুল ধারণা ও কুসংস্কার প্রচলিত রয়েছে। কেউ মনে করেন এ সময় সহবাস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, আবার অনেকে কোনো সতর্কতা ছাড়াই তা চালিয়ে যান। অথচ ইসলামী শরীয়ত ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান উভয়ই এ বিষয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
ইসলামের দৃষ্টিতে স্বামী-স্ত্রীর বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ক ইবাদতের মর্যাদা লাভ করে, যদি তা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হয়। কুরআনুল কারীমের সূরা আল-বাকারার ২২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা স্ত্রীদের ‘শস্যক্ষেত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের কাছে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, যা গর্ভধারণের কারণে রহিত হয়ে যায় না। তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ‘নিজে ক্ষতি করা যাবে না এবং অন্যেরও ক্ষতি করা যাবে না’—এই মহান নীতির আলোকে শরীয়ত নির্দেশ দেয় যে, যদি সহবাসের কারণে মা বা গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে তা থেকে বিরত থাকা জরুরি।
আধুনিক স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিক ও ঝুঁকিমুক্ত গর্ভাবস্থায় সহবাস সাধারণত নিরাপদ, কারণ গর্ভের শিশু জরায়ু, অ্যামনিওটিক তরল এবং জরায়ুমুখ দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। তবে অধিকাংশ চিকিৎসক গর্ভাবস্থার প্রথম ও শেষ তিন মাসকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সহবাস থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে, যেমন: যোনিপথে রক্তপাত, গর্ভপাতের ঝুঁকি, প্লাসেন্টা নিচে থাকা (Placenta previa), জরায়ুর মুখ আগে থেকেই খুলে যাওয়া, গর্ভের পানি ভেঙে যাওয়া, পূর্বে বারবার গর্ভপাতের ইতিহাস, যমজ বা উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা এবং চিকিৎসকের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকলে।
ইসলাম দাম্পত্য সম্পর্ককে ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বিবেচনা করে। গর্ভাবস্থায় সহবাসের ক্ষেত্রে স্ত্রীর সম্মতি ও স্বাচ্ছন্দ্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। এমন ভঙ্গি বেছে নেওয়া প্রয়োজন যাতে পেটে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে এবং স্ত্রী কোনো ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করলে অবিলম্বে তা বন্ধ করতে হবে। এছাড়া পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সহবাসের আগে ও পরে সুন্নত ও দোয়ার অনুসরণ করা উত্তম।
গর্ভাবস্থায় সহবাসের ফলে শিশুর ক্ষতি হয় বা চরিত্রের ওপর প্রভাব পড়ে—এমন ধারণার কোনো নির্ভরযোগ্য ইসলামী দলিল বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। আবার পুরো সময় সহবাস নিষিদ্ধ—এমন ধারণাটিও সঠিক নয়। বরং প্রতিটি দম্পতির উচিত গর্ভাবস্থার অবস্থা, মায়ের শারীরিক সক্ষমতা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন, স্ত্রীদের সঙ্গে উত্তমভাবে জীবনযাপন করতে। সুতরাং, একজন মুসলিম দম্পতির কর্তব্য হলো আল্লাহর বিধান, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ এবং চিকিৎসকের পরামর্শের সমন্বয়ে জীবন পরিচালনা করা।
অতএব তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে যেভাবে ইচ্ছা আসতে পার।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২২৩)» এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন যে, বৈধ উপায়ে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্কের অনুমতি রয়েছে।
মহান আল্লাহ বলেন— «﴿وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ﴾» অর্থ: “তোমরা তাদের সঙ্গে উত্তমভাবে জীবনযাপন কর।” (সূরা আন-নিসা, ৪:১৯) সুতরাং ইসলামী শরীয়ত ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান—উভয়ই ভারসাম্য, দায়িত্ববোধ ও নিরাপত্তার শিক্ষা দেয়।
