যুক্তরাষ্ট্রের সেই ক্যাম্প থেকে বিশ্বকাপের ফাইনালে রদ্রির রূপান্তরের গল্প

রদ্রির পরিবারে পড়াশোনার গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে অন্তত এক বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে হাইস্কুলে পড়াশোনা করুক। রদ্রির ফুটবলপ্রীতি সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে যেতেই হয়েছিল। তবে রদ্রির হিসাবে, সেই সময়টা ছিল ভুল। ১৪ বছর বয়সে মাদ্রিদ থেকে কানেটিকাটের গহিন বনের এক গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময়েই দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০১০ বিশ্বকাপ খেলছিল স্পেন। ক্যাম্পের এক কাউন্সেলরকে অনুরোধ করে তাঁর কম্পিউটারে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই বিশ্বকাপজয়ী গোলটি দেখেছিলেন রদ্রি। এর আগে স্পেনের কোনো ম্যাচ দেখার সুযোগ হয়নি তাঁর, কিন্তু ফাইনালে ইনিয়েস্তার গোলটি তাঁর জীবনে নিয়ে এসেছিল পরম আনন্দ।

ব্যাবসায় ডিগ্রি নেওয়া রদ্রি আজ ফুটবলে ব্যালন ডি’অর বিজয়ী। ১৬ বছর আগে যে কিশোরটি বিশ্বকাপে স্পেনের খেলা দেখতে না পারার দুঃখে কাতর ছিল, ভাগ্যের কী পরিহাস, সেই দেশেই আজ সে স্পেনের অধিনায়ক। মাঠের খেলায় স্পেন দলের জন্য রদ্রি যেন এক ‘শক অ্যাবজরবার’। অটোমোবাইল খাতের এই শব্দটি দিয়ে বোঝানো হয় যা গাড়ির ঝাঁকি সহ্য করে যাত্রাকে মসৃণ রাখে, স্পেনের মাঝমাঠে রদ্রির ভূমিকাও ঠিক তেমনই। বিপৎসীমা পার হওয়ার আগেই প্রতিপক্ষের আক্রমণ শুষে নেওয়া এক অজেয় বর্ম তিনি।

২২ মাস আগে মারাত্মক এসিএল চোটে পড়ে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে ছিলেন রদ্রি। সেই চোটের আগে ম্যানচেস্টার সিটির ট্রেবল জয় এবং ইউরোপীয় ফুটবলে দলটির আধিপত্যের প্রধান কারিগর ছিলেন তিনি। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত সিটির হয়ে টানা ৭৪ ম্যাচ অপরাজিত ছিলেন এই তারকা। এবারের বিশ্বকাপ যেন সেই পুরনো রদ্রিকেই ফিরিয়ে এনেছে। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে আইমেরিক লাপোর্ত ও পাউ কুবারসিকে নিয়ে স্প্যানিশ বক্সের সামনে গড়েছিলেন এক ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’। পরিসংখ্যান বলছে, ১৫টি ডুয়েলের মধ্যে ১১টিতে জিতে তিনি ছিলেন সবার সেরা। উল্টো ফরাসি খেলোয়াড়রাই বল কাড়তে গিয়ে তাঁকে তিনবার ফাউল করেছেন।

পুরো বিশ্বকাপে রদ্রির পরিসংখ্যানও ঈর্ষণীয়। ৭ ম্যাচে ৯টি গোল হওয়ার মতো পাস দিয়েছেন, পাসের সাফল্যের হার ৯৩ শতাংশ। বাতাসে বল দখলের লড়াইয়ে জয়ের হার ৭৯ শতাংশ এবং সফল ট্যাকল করেছেন ২২টি। তাঁর এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের কারণেই স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমনকে এই টুর্নামেন্টের সেরা আক্রমণভাগের বিপক্ষেও কোনো সেভ করতে হয়নি। ম্যাচ শেষে ক্লান্ত রদ্রি নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলেন, দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠে দল রোমাঞ্চিত, তবে এখন তাদের শান্ত থেকে বিশ্রাম নিতে হবে। সুপারহিরো দুই রকমের হয়—এক দল আক্রমণ করে, আর রদ্রি সেই বিরল ফুটবলার যিনি আক্রমণ শুষে নিয়ে দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নেন।

সেই চোটের আগে ২০২২-২৩ মৌসুমে সিটির ‘ট্রেবল’ জয়ে এবং তারপর ইংলিশ ও ইউরোপীয় ফুটবলে ম্যানচেস্টার সিটির আধিপত্যের মূল কারিগর ছিলেন রদ্রি।

৭ ম্যাচে গোল হওয়ার মতো পাস দিয়েছেন ৯টি, সফল পাসের সংখ্যা ৯৩% (৬৫৬)।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo