জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে ইমপ্ল্যান্ট বাণিজ্যের ভয়ংকর সিন্ডিকেট

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) চিকিৎসাধীন অসহায় রোগীদের জিম্মি করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল সিন্ডিকেট। হাসপাতালেরই কিছু অসাধু চিকিৎসক, নার্স, ওটি বয় এবং বহিরাগতদের সাথে অর্থোপেডিক ইমপ্ল্যান্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে এই বাণিজ্য চলছে। দৈনিক এদিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে যে, এই চক্রটি নিজেদের সুবিধামতো ইমপ্ল্যান্টের চড়া দাম নির্ধারণ, অনৈতিক কমিশন গ্রহণ এবং রোগীদের অন্ধকারে রেখে নিম্নমানের ডিভাইস ব্যবহারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ হলো, অধিক মুনাফার লোভে রোগীদের শরীরে ব্যবহৃত পুরনো অর্থোপেডিক ইমপ্ল্যান্ট পুনরায় ব্যবহারের বিষয়টি। বাংলাদেশ মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, স্টেইনলেস স্টিল ও টাইটানিয়াম ইমপ্ল্যান্টের গুণগত মানের বড় ব্যবধান থাকলেও, অসাধু চিকিৎসক ও বিক্রয় প্রতিনিধিদের যোগসাজশে প্রকৃত বাজারদর গোপন রাখা হয়। অস্ত্রোপচারের পর ঠিক কোন ব্র্যান্ড বা সাইজের ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করা হলো, তার কোনো দাপ্তরিক নথি বা ক্যাশ মেমো রোগীদের দেওয়া হয় না।

হাসপাতালের এক চিকিৎসক দাবি করেছেন, ইমপ্ল্যান্ট বিক্রির দায় বিপণন কোম্পানিগুলোর, তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরবরাহকারী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, প্রতিটি বিক্রির বিপরীতে চিকিৎসকদের নির্ধারিত কমিশন দিতে হয়। হাসপাতাল প্রশাসনের অলিখিত নির্দেশনার কারণেই এসব তথ্য রোগীদের কাছে গোপন রাখা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এছাড়া, অপারেশন থিয়েটারে ছোট আকারের ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করে খরচ কমানো হলেও রোগীদের সেই অতিরিক্ত অর্থ ফেরত দেওয়া হয় না, বরং নানা অজুহাতে আরও টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ইমপ্ল্যান্টের প্যাকেটে থাকা বারকোড রোগীর ফাইলে যুক্ত করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ মেডিকেল ইকুইপমেন্ট ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড সাপ্লাইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক মইনুল ইসলাম জানান, সরকারি পর্যায়ে ইমপ্ল্যান্টের মূল্য নির্ধারিত না থাকায় চিকিৎসকরাই দাম নির্ধারণ করছেন। দেশে অনুমোদিত ৮ থেকে ১০টি আমদানিকারকের বাইরে ৩০টিরও বেশি অবৈধ প্রতিষ্ঠান লাগেজ পার্টির মাধ্যমে ইমপ্ল্যান্ট আনছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন স্বীকার করেছেন যে, মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে তারা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং দ্রুতই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আমদানিকারকদের সাথে যৌথ বৈঠকের মাধ্যমে নীতিমালা তৈরির আশ্বাস দিয়েছেন।

আইনি নিয়ম অনুযায়ী, রোগীর শরীর থেকে বের করা ইমপ্ল্যান্ট পরিষ্কার করে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করার কথা, অথবা তা ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য হিসেবে ধ্বংস করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু পঙ্গু হাসপাতালে শরীর থেকে বের করা পিন, তার বা রড পুনরায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ব্যবহারের অযোগ্য স্ক্রু বা প্লেট টেন্ডারের মাধ্যমে বিক্রি করলেও, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো ওটির বাইরে গিয়ে আবার ব্যবহৃত হচ্ছে।

নিটোর-এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান ইমপ্ল্যান্ট অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. লেলিন চৌধুরী সতর্ক করে বলেছেন, ব্যবহৃত ইমপ্ল্যান্টের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানিয়েছেন, রোগীদের তথ্য সরবরাহ না করা এবং নিয়মবহির্ভূত ব্যবহারের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত