অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো, টেস্ট ক্রিকেটে এমন কীর্তির মাহাত্ম্য বোঝাতে পরিসংখ্যান যথেষ্ট নয়। এই যেমন ডারউইনে বাংলাদেশের ৯ উইকেটে পাওয়া জয়ের পর, এর মাহাত্ম্য বুঝাতে ফুরিয়ে যাচ্ছে শব্দ ভান্ডার। এই জয়টাকে শুধু বাংলাদেশের প্রথম অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় বললে যেন গল্পটা পুরো বলা হয় না। এই জয় এসেছে এমন এক দুর্গে, যেখানে বছরের পর বছর বিশ্বের সেরা দল ও সেরা প্রজন্মগুলোও গিয়ে থমকে দাঁড়িয়েছে। ভারতকে সরিয়ে রাখলে বাংলাদেশের আগে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জিতেছে পাকিস্তান। কিন্তু তাদের সেই সর্বশেষ জয়টিও ১৯৯৫ সালে, সিডনিতে ৭৪ রানে। এরপর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাকিস্তান খেলেছে আরও বহু টেস্ট, কিন্তু আর জয় পায়নি। এমনকি ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, শোয়েব আখতার, সাকলায়েন মুশতাক, সাঈদ আনোয়ার, ইনজামাম-উল-হক কিংবা আবদুর রাজ্জাকের মতো তারকায় ঠাসা দলও সেই দুর্গ ভাঙতে পারেনি।
শুধু পাকিস্তান নয়, শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট ইতিহাসের সোনালি প্রজন্মও পারেনি এই কাজটি। কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, সনৎ জয়াসুরিয়া, লাসিথ মালিঙ্গা, মুত্তিয়া মুরালিধরন, অরবিন্দ ডি সিলভা, অর্জুনা রানাতুঙ্গা কিংবা তিলকারত্নে দিলশানের মতো তারকারা শ্রীলঙ্কাকে বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তির কাতারে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় অধরাই থেকেছে তাদের। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শ্রীলঙ্কার প্রথম টেস্ট জয়ও নিজেদের মাঠে; অস্ট্রেলিয়ায় তাদের কোনো টেস্ট জয় নেই। আর সেই অসম্ভব কাজটাই করে ফেলল বাংলাদেশ। ডারউইনে শুধু জয় আসেনি, এসেছে দাপটের সঙ্গে। অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ করেছে ৪২৬। অর্থাৎ লিড ২২৮ রানের। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের শক্তি এবং মানসিকতার এক বিরাট ঘোষণা। তানজিদ হাসানের সেঞ্চুরি, নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪, এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ ও লোয়ার অর্ডারের প্রতিরোধ। সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণকেও দীর্ঘ সময় মাঠে থাকতে হয়েছে।
আর সেই বোলিং আক্রমণটি কেমন ছিল, সেটাও মনে রাখা দরকার। প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়ন, চারজনেরই টেস্ট উইকেট ছিল ৩০০ বা তার বেশি। টেস্টে এই চারজনের সম্মিলিত উইকেট সংখ্যা ১৭১৮টি। টেস্ট ইতিহাসে এমন বোলিং চতুষ্টয়ের সামনে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ৪২৬ রান করে ফেলা জয়টাকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। তারপর বল হাতে হাসান মাহমুদের আগুন। প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট, ম্যাচে মোট ৯। আর দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজের ৫ উইকেট। ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের প্রতিরোধও শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়াকে বাঁচাতে পারেনি। ২৮৪ রানে অলআউট হয়ে বাংলাদেশের সামনে তারা রাখে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য। বাংলাদেশ সেই লক্ষ্য পেরিয়েছে মাত্র এক উইকেট হারিয়ে। ফল, ৯ উইকেটের জয়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবার।
আরও বড় ব্যাপার, জয়টি এসেছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষে থাকা ‘মাইটি অস্ট্রেলিয়া’র বিপক্ষে। সিরিজ শুরুর আগে বাংলাদেশকে ফেবারিট হিসেবে কেউ দেখেনি। বরং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে যাওয়া দলটির জন্য এই সফরই ছিল বড় পরীক্ষা। কিন্তু ডারউইনে সেই হিসাব বদলে দিয়েছে বাংলাদেশ। কলোম্বোতে ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কাকে হারানোর মাধ্যমে দেশের বাইরে প্রথম কোনো বড় দলের বিপক্ষে টেস্ট জেতে বাংলাদেশ। এরপর ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডে মাউন্ট মাঙ্গানুইয়ে জয়টা বিশেষ, উপমহাদেশের বাইরে প্রথম কোনো বড় দলকে তাদের মাটিতে টেস্টে হারানো তো চারটি খানি কথা না। এরপর ২০২৪ সালে পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ হারানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে যে ধাপে-ধাপে এগোচ্ছিল, ডারউইনের জয় যেন সেই যাত্রার সবচেয়ে উজ্জ্বল চূড়া।
নাজমুল হোসেন শান্তর বাংলাদেশ তাই শুধু অস্ট্রেলিয়াকে হারায়নি। তারা নিজেরাই একটা প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছে। সেটা কী? বড় দলের বিপক্ষে, বড় মঞ্চে, বড় চাপের মধ্যে বাংলাদেশ কি সত্যিই জিততে পারে? ডারউইন বলছে, পারে। টানা ১১ সেশনে আধিপত্য দেখিয়ে অজিদেরকে তাদের মাটিতে চূর্ণ করেছে বাংলাদেশ। এই জয়ের মাধ্যমে টাইগাররা পুরো ক্রিকেট বিশ্বকেই একটা বার্তা দিল। আমরা প্রস্তুত!

