বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত প্রায় চার ঘণ্টার দীর্ঘ তথ্যচিত্র ‘মাস্ক’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। অস্কারজয়ী নির্মাতা অ্যালেক্স গিবনি পরিচালিত এই চলচ্চিত্রটি টেসলা ও স্পেসএক্সের কর্ণধারকে কেবল একজন ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের এক বিতর্কিত প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করেছে। সমালোচকদের বড় একটি অংশ এটিকে মাস্কের জীবনের সবচেয়ে নির্মম ও অনুসন্ধানী সিনেমাটিক পাঠ হিসেবে অভিহিত করলেও, মাস্কের দাবি এটি মিথ্যা, বিরক্তিকর এবং মানহানিকর এক অভিযোগপত্র।
একুশ শতকের প্রযুক্তি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ইলন মাস্কের যাত্রার শুরুটা ছিল ডটকম যুগে জিপ২ ও পেপালের সাফল্য দিয়ে। সেখান থেকে মহাকাশ প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ কীভাবে একজন মানুষের হাতে চলে এল, সেই দীর্ঘ আখ্যান তুলে ধরেছেন গিবনি। নির্মাতার মতে, এই চলচ্চিত্রটি কেবল মাস্কের ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং একজন ব্যক্তির হাতে অকল্পনীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত হওয়ার পরিণতি ও তার সম্ভাব্য ভয়াবহতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
গিবনি জানিয়েছেন, এই প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের সময় তিনি মাস্কের ঘনিষ্ঠ মহলের ব্যক্তিদের মধ্যেও একধরনের ভীতি লক্ষ্য করেছেন, যেখানে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেছেন। তাঁর মতে, মাস্কের এই প্রভাব ও অবারিত ক্ষমতা বিশ্ব গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রথমে দুই ঘণ্টার প্রকল্প হিসেবে চিন্তা করলেও, মাস্কের ব্যবসা থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা পর্যবেক্ষণ করে পরিচালক এর ব্যাপ্তি বাড়িয়ে চার ঘণ্টায় নিয়ে যান।
ছবিটির একটি বিশেষ দিক হলো, এতে মাস্ক নিজে সরাসরি সাক্ষাৎকার দেননি। তাঁর অনুপস্থিতি কাটাতে গিবনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল অবতারের সহায়তা নিয়েছেন। মাস্কের পুরোনো সাক্ষাৎকার ও বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই ডিজিটাল রূপটি নিয়ে নৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি প্রশংসা কুড়িয়েছে। দ্য হলিউড রিপোর্টারের ডেভিড রুনির মতো সমালোচকরা মনে করেন, মাস্কের বক্তব্যকে তাঁরই বিরুদ্ধে আয়না হিসেবে ব্যবহার করার এই কৌশলটি সৃজনশীলভাবে অসাধারণ।
তথ্যচিত্রে মাস্কের ব্যক্তিজীবনের বেশ কিছু অন্ধকার ও বিতর্কিত অধ্যায়ও উঠে এসেছে। তাঁর প্রথম স্ত্রী জাস্টিন মাস্ক তাঁদের সম্পর্ক, সন্তান এবং সন্তানের অকাল মৃত্যুর বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন। এছাড়া মাস্কের সাবেক সঙ্গী অ্যাশলি সেন্ট ক্লেয়ার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্যমতে, মাস্ক তাকে গৃহযুদ্ধের আগে ‘অনেক সন্তান’ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। এমনকি সেন্ট ক্লেয়ার জানিয়েছেন, তাঁদের মধ্যকার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে চুপ থাকার বিনিময়ে তাঁকে ৪ কোটি ডলারের একটি গোপনীয়তা চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
ছবিটি দেখার পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। ভ্যারাইটি একে প্রযুক্তিনির্ভর মেধা ও ক্ষমতার লালসার তীক্ষ্ণ প্রতিকৃতি বলেছে, অন্যদিকে ডেডলাইন একে নিষ্ঠুর কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে চার ঘণ্টার দীর্ঘ ব্যাপ্তি এবং পরিচিত বিতর্কের পুনরাবৃত্তি নিয়ে সমালোচকদের মাঝে দ্বিমতও রয়েছে। কারো কারো কাছে এটি একটি জরুরি অনুসন্ধানী দলিল, আবার কারো কাছে এটি কেবল একটি একপেশে অভিযোগপত্র।
ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগেই ইলন মাস্ক ও তাঁর আইনজীবীরা এর তীব্র বিরোধিতা করেছেন। মাস্কের অভিযোগ, এটি মানহানিকর ও মিথ্যা তথ্যে ঠাসা। তাঁর পক্ষ থেকে নির্মাতা ও পরিবেশকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। গিবনি অবশ্য এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ছবির প্রতিটি তথ্য কঠোরভাবে যাচাই করা হয়েছে এবং আইনি পর্যালোচনার পরই এটি প্রদর্শনের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। পরিশেষে, গিবনির এই তথ্যচিত্র ইলন মাস্ককে ঘিরে তৈরি হওয়া মুগ্ধতা ও বিতর্কের দোলাচলে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইলন মাস্ককে কেউ দেখেন ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেউ মনে করেন, তিনি প্রচলিত নিয়ম ভেঙে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আবার সমালোচকদের চোখে মাস্ক এমন এক ধনকুবের, যার হাতে ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভবন গণতন্ত্রের জন্যই ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু প্রচলিত জীবনীচিত্রের মতো ‘সংগ্রাম থেকে সাফল্য’ দেখিয়ে থেমে যাননি নির্মাতা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ফলে ছবিটি যত এগিয়েছে, ততই গিবনির কাছে মাস্কের গল্প হয়ে উঠেছে ক্ষমতা ও তাঁর জবাবদিহির গল্প। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামনে নেই মাস্ক, আছে তাঁর ‘ডিজিটাল রূপ’ তথ্যচিত্রটির সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো, মাস্ক নিজে ছবিতে সাক্ষাৎকার দেননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্ক্রিনে দেখা যায়, মাস্কের মতো দেখতে একটি ডিজিটাল চরিত্র। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ নির্মাতা নতুন কোনো বক্তব্য মাস্কের মুখে বসাননি; বরং তাঁরই পুরোনো কথাগুলো নতুন প্রেক্ষাপটে হাজির করেছেন।

