উদ্যোক্তার অভাবে খালি পড়ে আছে বিসিকের শত শত শিল্পপ্লট

দেশজুড়ে শিল্পায়নের লক্ষ্য নিয়ে গড়ে তোলা বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) বিভিন্ন শিল্পনগরী ও শিল্পপার্কে শত শত প্লট দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। বিসিকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ১৯টি শিল্পনগরী ও শিল্পপার্কে ৯৭৫টি শিল্পপ্লট বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে চলতি বছর সেই সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ৬৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বরাদ্দের তালিকায় প্লটের সংখ্যা বেড়েছে ৬৯০টি বা প্রায় ৭১ শতাংশ। বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ১৯টি শিল্পনগরীর মধ্যে ১৩টির প্লট এবারও বরাদ্দের তালিকায় রয়ে গেছে, যা প্রমাণ করে যে আগের বিজ্ঞপ্তির প্লটগুলো এখনো উদ্যোক্তাহীন অবস্থায় আছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা গেছে মুন্সীগঞ্জের বৈদ্যুতিক পণ্য উৎপাদন ও হালকা প্রকৌশল শিল্পনগরীতে। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিল্পনগরীর ৩৬১টি প্লটের মধ্যে শুরুতে মাত্র ২৯টি বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়েছিল। এরপর অবশিষ্ট ৩৩২টি প্লটের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও গত এক বছরে মাত্র ছয়টি প্লট বরাদ্দ হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৩২৬টি প্লট খালি পড়ে আছে। বিসিক কর্মকর্তাদের মতে, এই শিল্পনগরীতে প্রতি একর জমির মূল্য ৯ কোটি ১৬ লাখ টাকার বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। উচ্চ জমিমূল্য, অবকাঠামো স্থাপনের বাড়তি ব্যয় এবং পর্যাপ্ত সংযোগ সুবিধার অভাবকে এই স্থবিরতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজশাহী-২ বিসিক শিল্পনগরীর চিত্রও একই রকম। গত বছর সেখানে ২৩৭টি প্লট বরাদ্দের জন্য রাখা হলেও এক বছরে মাত্র ২৮টি বরাদ্দ হয়েছে, ফলে এখনো ২০৯টি প্লট খালি। এই প্লটগুলো স্কয়ার ও নাবিল গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠীকে দেওয়ার আগ্রহ দেখানো হয়েছিল। তবে পরিদর্শনের পর তারা বিসিকের প্লটের চেয়ে বেসরকারি জমি কিনে কারখানা স্থাপনকেই বেশি লাভজনক মনে করেছে। এ বিষয়ে বিসিক রাজশাহীর আঞ্চলিক পরিচালক জাফর বায়েজীদ জানান, উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের আগে সম্ভাব্য মুনাফা ও বাজারের বাস্তবতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।

অন্যান্য এলাকার শিল্পনগরীগুলোর অবস্থাও বেশ নাজুক। গোপালগঞ্জ শিল্পনগরীর সম্প্রসারণ প্রকল্পে ৯৯টি প্লটের মধ্যে ৪৭টিতে উদ্যোক্তা পাওয়া গেলেও বাকি ৫২টির জন্য নতুন করে বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়েছে। সুনামগঞ্জে ৩১টি প্লটের মধ্যে মাত্র দুটি বরাদ্দ হয়েছে। রাঙ্গামাটি ও মৌলভীবাজার শিল্পনগরীর অবস্থা আরও খারাপ, সেখানে চারটি করে মোট আটটি প্লটের একটিও উদ্যোক্তারা গ্রহণ করেননি। অন্যদিকে, মাদারীপুরে বরাদ্দযোগ্য প্লটের সংখ্যা ২৬ থেকে বেড়ে ৬৯টিতে উন্নীত হয়েছে।

চলতি বছরের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে চট্টগ্রামের রাউজান শিল্পনগরী, যেখানে ১৬৩টি প্লট বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া বরিশাল, খাগড়াছড়ি ও মেহেরপুরেও নতুন প্লট যুক্ত হয়েছে। বিসিকের পরিচালক (শিল্প উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ) কাজী নজরুল ইসলাম স্বীকার করেছেন যে, অতীতে রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল, যার নেতিবাচক প্রভাব এখনো বিদ্যমান।

শিল্প স্থাপনে এই অনীহার পেছনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের উচ্চমূল্য, ঋণপত্র খোলার জটিলতা, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সব শিল্পনগরীর চিত্র একই নয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের সিরাজগঞ্জ শিল্পপার্কে এবার ৫৫৭টি প্লট বরাদ্দের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যমুনা সেতুর কাছাকাছি কৌশলগত অবস্থান এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই শিল্পপার্কটি নিয়ে বিসিক বেশ আশাবাদী। চাকরির আরও তথ্য: এক বছর আগে যেসব প্লট বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বড় অংশে উদ্যোক্তা না মেলায় আবারও নতুন করে আবেদন আহ্বান করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। চাকরির আরও তথ্য: এতে স্পষ্ট হয়েছে, পূর্বের বিজ্ঞপ্তিতে থাকা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্লট এখনো বিনিয়োগকারীর অপেক্ষায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন শিল্পনগরীতে অবকাঠামো, শ্রমবাজার ও ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে উদ্যোক্তাদের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সুনামগঞ্জে ৩১টির মধ্যে মাত্র দুটি, শ্রীমঙ্গলে ৬৫টির মধ্যে ছয়, বরগুনায় ২৩টির মধ্যে আট এবং চুয়াডাঙ্গায় ৫১টির মধ্যে ১৪টি প্লট বরাদ্দ হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভালো কোম্পানি আনতে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে জোর বিএসইসির। চাকরির আরও তথ্য: এলএনজিতে রেকর্ড বিনিয়োগ, ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় চুক্তি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে কিশোরগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, লালমনিরহাট, পটুয়াখালী ও ভোলা শিল্পনগরীর প্রায় সব প্লটই ইতোমধ্যে উদ্যোক্তারা বরাদ্দ নিয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সাড়া না পাওয়ায় বড় শিল্পগ্রুপগুলোকে প্লট বরাদ্দের উদ্যোগও নিয়েছিল বিসিক।