আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ফাইভআরে সংঘবদ্ধ অ্যাকাউন্ট পরিচালনা এবং মার্কেটপ্লেস কারসাজির গুরুতর অভিযোগে বিটোপিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে হাজার হাজার কর্মীর এনআইডি ও পাসপোর্টের তথ্য ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলা, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানের হাতে রাখা এবং ভুয়া রিভিউ বা অর্ডারের মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মের র্যাংকিং প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে, গত জুলাই মাসের শেষের দিকে ফাইভআর কর্তৃপক্ষ বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৩০০টি অ্যাকাউন্ট স্থগিত করে। একই সঙ্গে আরও হাজার হাজার অ্যাকাউন্ট নিবিড় পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিটোপিয়া-সংশ্লিষ্ট এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া প্রায় ১৫ লাখ মার্কিন ডলার সমমূল্যের কাজ বাতিল করেছে ফাইভআর কর্তৃপক্ষ।
ফাইভআরের কমিউনিটি ফোরামের বাংলাদেশ অংশে গত ৪ আগস্ট ২০২৬ একটি আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানে সরাসরি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ না করলেও, সংঘবদ্ধভাবে অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ ও মার্কেটপ্লেসের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। ফাইভআর জানায়, প্রাথমিক তদন্তে নীতিমালা লঙ্ঘনকারী অ্যাকাউন্ট ও অর্ডার শনাক্ত করা হয়েছে এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মার্কেটপ্লেসে তাদের অবস্থান নিচে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিটোপিয়া গ্রুপের যাত্রার শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে ‘বিডিকলিং আইটি’ নামে। বর্তমানে রাজধানীর গুলশান অ্যাভিনিউয়ের লোটাস কামাল টাওয়ার-২-এর ষষ্ঠ তলায় (৫৯ ও ৬১ নম্বর) তাদের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত। এছাড়া গুলশান-১-এর ৮ নম্বর রোডের ২৯ নম্বর বাড়িতে তারা ৮ দশমিক ৮ শতাংশ জমিতে একটি ৯ তলা ভবন কিনেছে। তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী, দেশের বাইরেও বিটোপিয়া গ্রুপের ৫টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ফাইভআরের নীতিমালা অনুযায়ী, একজন ব্যবহারকারী কেবল নিজের পরিচয়ে একটি অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারেন। অন্যের আইডি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খোলা বা থার্ড পার্টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বিটোপিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা কর্মীদের এনআইডি ও পাসপোর্টের তথ্য নিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করত, এমনকি কর্মীরা চাকরি ছাড়লেও সেই আইডিগুলোর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতেন না।
প্রতিযোগীদের ব্যবসায়িক ক্ষতি করতেও বিটোপিয়া এই কৌশল ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফ্রিল্যান্সার এম এন নাহিদের ফেসবুক পোস্টের পর বিষয়টি সামনে আসে যে, প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রিল্যান্সারদের গিগ বা অ্যাকাউন্টের র্যাংকিং কমাতে ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে অর্ডার দিয়ে পরে তা বাতিল বা রিফান্ড করা হতো। এ বিষয়ে বিটোপিয়ার এক সাবেক কর্মীর জবানবন্দিও বিতর্ক উসকে দেয়।
বিটোপিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনির হোসেন গত ১৮ আগস্ট এ প্রতিবেদককে দাবি করেন, তথ্য ফাঁসকারী কর্মীকে তিনি চাকরিচ্যুত করেছেন। তিনি আরও বলেন, তিনি এই ব্যবসা থেকে সরে আসতে চাইছেন এবং ফাইভআরে তার অনেক আইডি এখন ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কেবল অনলাইন কারসাজি নয়, বরং সাবেক কর্মীদের পাসপোর্ট আটকে রাখা, চাকরি ছাড়লে হয়রানি, বিনা মূল্যে কাজ করানো এবং বেতন বৈষম্যের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রভিডেন্ট ফান্ড, স্বাস্থ্যবিমা বা গ্র্যাচুইটির মতো কোনো স্বচ্ছ নীতিমালা নেই বলেও দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। এছাড়া নেতিবাচক ভাবমূর্তি আড়ালে তারা ফায়ারএআই, জেভিএআই, স্পার্কটেক, সফটভেন্স ও এসএমটেকের মতো বিভিন্ন নামে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করত বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক ফায়সাল আলিম বলেন, ফ্রিল্যান্সারদের অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার এই অপচেষ্টা অত্যন্ত নিন্দনীয়। যারা তরুণদের সম্ভাবনাময় এই খাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
খাতসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের দায় পুরো বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের ওপর পড়লে অসংখ্য প্রকৃত ফ্রিল্যান্সার এর মাশুল দেবেন। এক অভিজ্ঞ ফ্রিল্যান্সারের মতে, বিটোপিয়া যা করছে তা কেবল অনৈতিকই নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত ডিজিটাল স্ক্যাম, যা সাধারণ ফ্রিল্যান্সারদের বছরের পর বছর ধরে গড়া ক্যারিয়ার মুহূর্তেই ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঘটনাটি বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সিং অঙ্গনেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০১৭ সালে শুরু হয়েছিল প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান বিডিকলিং আইটির যাত্রা, বর্তমানে সেখান থেকে নাম হয়েছে বিটোপিয়া গ্রুপ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই গ্রুপ বেশ কিছু স্থাবর সম্পত্তিও কিনেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাজধানীর লোটাস কামাল টাওয়ার-২, লেভেল ৬, (৫৯ ও ৬১), সাউথ অ্যাভিনিউ, গুলশান অ্যাভিনিউ ঠিকানায় তাদের প্রধান কার্যালয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ছাড়া রাজধানীর বনশ্রী, মহাখালিতেও তাদের কার্যালয় আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গুলশানে বিডি কলিং আইটি লিমিটেডের নামে কিছুদিন আগেই তারা কিনেছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ জমিতে একটি ৯ তলা ভবন (বাড়ি ৮/সি, রোড ২৯, গুলশান ১, ঢাকা)। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভবেন বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘এই সম্পত্তি প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি, কেরানীগঞ্জ শাখা, ঢাকা এর নিকট দায়বদ্ধ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে বাংলাদেশ থেকে কীভাবে পরিচালিত হয় তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে।

