ব্যাংক র‍্যাংকিং ২০২৫: শীর্ষে ব্র্যাক, সিটি ও প্রাইম

দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা ও পরিচালনাগত সাফল্যের ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের ব্যবধানের চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তৈরি করা ব্যাংক র‍্যাংকিংয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো নিজের শীর্ষস্থান অক্ষুণ্ন রেখেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এটি এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার ত্রয়োদশ সংস্করণ। ২০১৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর আর্থিক সুচক ও পারফরম্যান্স বিবেচনা করে এ বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করে আসছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। এবারের মূল্যায়নে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১টি ব্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আর্থিক সক্ষমতার সাতটি মৌলিক সূচকে মোট ৭০ নম্বরের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক সর্বোচ্চ ৫০ দশমিক ৭৪ স্কোর অর্জন করেছে। এই তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অক্ষুণ্ন রেখেছে যথাক্রমে সিটি ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংক। সিটি ব্যাংকের স্কোর ৪৪ এবং প্রাইম ব্যাংকের স্কোর ৪১ দশমিক ২৯। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ২০২৪ সালের র‍্যাংকিংয়েও এই তিনটি ব্যাংক যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে ছিল। তবে এবারের র‍্যাংকিংয়ে শুধু এই শীর্ষ তিন ব্যাংকের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে, বাকি অবস্থানগুলোতে বড় ধরনের রদবদল লক্ষ্য করা গেছে।

এবারের তালিকায় সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে পূবালী ব্যাংক। গতবারের র‍্যাংকিংয়ে পঞ্চম স্থানে থাকা এই ব্যাংকটি এবার ৪১ দশমিক শূন্য ৪ স্কোর নিয়ে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। অপরদিকে, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ৩৯ দশমিক ৪৯ স্কোর অর্জন করে পঞ্চম স্থানে জায়গা করে নিয়েছে। তবে গতবারের চতুর্থ স্থানে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংক এবার দুই ধাপ নিচে নেমে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। এর বাইরে যমুনা ব্যাংক ২০২৪ সালের ১২তম অবস্থান থেকে এক লাফে সপ্তমে উঠে এসে বড় ধরনের উন্নতি দেখিয়েছে।

শীর্ষ দশের বাকি অবস্থানগুলোর মধ্যে উত্তরা ব্যাংক ৩৪ দশমিক ১৬ স্কোর পেয়ে অষ্টম স্থানে রয়েছে। নবম স্থানে উঠে এসেছে এনসিসি ব্যাংক, যা গতবার ছিল ১১তম অবস্থানে। সবচেয়ে লক্ষণীয় অগ্রগতি দেখিয়েছে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক। আগের বার ১৫তম অবস্থানে থাকা এই ব্যাংকটি এবার পাঁচ ধাপ এগিয়ে দশম স্থানে জায়গা করে নিয়েছে। সাতটি সূচকের মূল্যায়নে সর্বোচ্চ নম্বর হচ্ছে ১০, যার ভিত্তিতে মোট স্কোর নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০। মূল্যায়নের মূল সূচকগুলোর মধ্যে রয়েছে আরওএ (ROA), আরওই (ROE), এনপিএল (NPL), সিএআর (CAR) এবং এনএভিপিএস (NAVPS)।

উভয় ধরনের সূচকভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতিতেই ব্র্যাক ব্যাংক প্রথম স্থান অধিকার করেছে। ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রেফাত উল্লাহ খান এই অর্জনে সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থান ধরে রাখতে পারা ব্যাংকটির জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। তিনি ব্যাংকের গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। একইভাবে সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন বলেন, ব্যাংকটির প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি হচ্ছে সুশাসন ও দায়িত্বশীল ব্যাংকিং কার্যক্রম। সিটি ব্যাংক সাত ও পাঁচ উভয় স্কেলেই দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছে।

তৃতীয় স্থানে থাকা প্রাইম ব্যাংক সঞ্চিতি সংরক্ষণের হারে পূর্ণ নম্বর পেয়েছে। অন্যদিকে, চতুর্থ স্থানে উঠে আসা পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, গ্রাহকদের আস্থা, সুশাসন ও কমপ্লায়েন্স বজায় রাখার ফলেই ব্যাংকটির আর্থিক সূচকে এই ধারাবাহিক উন্নতি সম্ভব হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ছিল মাত্র ২ শতাংশ। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এনএভিপিএস ও মূলধন পর্যাপ্ততার সূচকে ভালো করায় এক ধাপ এগিয়ে পঞ্চমে এসেছে। বিপরীতে, অতীতে শীর্ষে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংক এবার ষষ্ঠ অবস্থানে নেমে গেছে, যা একসময় ২০২১ ও ২০২২ সালেও প্রথম অবস্থানে ছিল।

শীর্ষ দশের বাইরে অন্যান্য ব্যাংকের অবস্থানেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে। ট্রাস্ট ব্যাংক ২০২৪ সালের ভালো অবস্থান থেকে পিছিয়ে এবার যথাক্রমে ১৪ ও ১৫তম স্থানে নেমে গেছে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকও পিছিয়ে ১২তম স্থানে রয়েছে, যার স্কোর ২৮ দশমিক ৪৮। একই স্কোর নিয়ে ঢাকা ব্যাংকও রয়েছে কাছাকাছি অবস্থানে। এছাড়া মিডল্যান্ড ব্যাংক ১৫তম, সাউথইস্ট ব্যাংক ১৬তম, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ১৭তম, এনআরবি ব্যাংক ১৮তম, ওয়ান ব্যাংক ১৯তম এবং আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ২০তম অবস্থানে রয়েছে।

তালিকায় আরও পিছনের সারিতে রয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), যার অবস্থান ২৪তম। দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবার ২৫তম অবস্থানে নেমে গেছে। দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক রূপালী ব্যাংক রয়েছে ২৬তম স্থানে। এরপর প্রিমিয়ার ব্যাংক ২৭তম এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ২৮তম অবস্থানে রয়েছে। তালিকার একেবারে তলানিতে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে আইএফআইসি ব্যাংক ২৯তম, এবি ব্যাংক ৩০তম এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ৩১তম অবস্থানে রয়েছে।

এই মূল্যায়নের মাধ্যমে শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর মধ্যকার বড় ব্যবধান আরও একবার স্পষ্ট হয়েছে। ৭০ নম্বরের মধ্যে সবচেয়ে নিচে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংকের স্কোর ১-এর নিচে নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯৩। অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা প্রয়োজন এবং দেশের ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এই র‍্যাংকিং শুধু ব্যাংকের মুনাফার চিত্র নয়, বরং তাদের মূলধন ও সার্বিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আসল রূপও প্রকাশ করে।

ব্যাংকিং খাতের এই সার্বিক বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগের উচ্চ সুদহার অনেক ব্যাংকের মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করে লাভবান হওয়ার প্রবণতাও স্পষ্ট। সার্বিকভাবে, ২০২৫ সালের এই আর্থিক চিত্রটি একদিকে যেমন শক্তিশালী মূলধন, কম খেলাপি ঋণ ও পর্যাপ্ত সঞ্চিতি থাকা সবল ব্যাংকগুলোর এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দেয়, ঠিক অন্যদিকে দুর্বল আর্থিক ভিত্তির ব্যাংকগুলোর দৈন্যদশা ও তীব্র ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আরওএতে সর্বোচ্চ মান হিসেবে ৫ শতাংশ, আরওইতে ৩০ শতাংশ, এনপিএলে ১ শতাংশ, সিএআরে ২০ শতাংশ, এনএভিপিএসে ১০০ টাকা এবং প্রভিশন কাভারেজে ১০০ শতাংশকে বিবেচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নিট মুনাফার ক্ষেত্রে আগের ১ হাজার কোটি টাকার পরিবর্তে এবার ২ হাজার কোটি টাকাকে সর্বোচ্চ মান ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশাপাশি নিট মুনাফা ও এনএভিপিএস বাদ দিয়ে পাঁচটি সূচকের ওপর ভিত্তি করেও আলাদা ৫০ নম্বরের র‍্যাংকিং করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাত সূচকে ৫০ দশমিক ৭৪ এবং পাঁচ সূচকে ৩৪ দশমিক ২৪ নম্বর পেয়েছে ব্যাংকটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাত সূচকে ৪৪ এবং পাঁচ সূচকে ৩৩ দশমিক ৩১ নম্বর পেয়েছে ব্যাংকটি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ২ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা এবং নিট মুনাফা ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা হয়েছে বলে তিনি জানান।