সীমান্তবর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় দেশ থেকে জ্বালানি পাচারের ঘটনা ঘটছে। এই পাচার রোধ করতেই সরকার জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদেশি মুদ্রায় জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে। কিন্তু প্রতিবেশী দেশগুলোতে জ্বালানির উচ্চমূল্য বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মজুত পরিস্থিতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশের জ্বালানি তেলের দামের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। এতে দেখা যায়, ডিজেলের প্রতি লিটারের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় কলকাতায় ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং দুবাইয়ে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করা হলে বর্তমানে দেশে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম হতো ২০৫ টাকা। তবে সাধারণ মানুষ, গণপরিবহন এবং সেচনির্ভর কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমাতে সরকার বিশাল অংকের ভর্তুকি দিয়ে দাম কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, পাচার ঠেকানো এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো সচল রাখতে এই দাম সমন্বয় জরুরি ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিকে তিনি নজিরবিহীন ও জটিল হিসেবে অভিহিত করেন। প্রতিমন্ত্রী জানান, বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের ২০ শতাংশ এবং বাংলাদেশের আমদানিকৃত জ্বালানির ৭০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এ পর্যন্ত ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। অতীতে অর্জিত অতিরিক্ত তহবিলের মাধ্যমে এতদিন এই লোকসান সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না।
মূল্যবৃদ্ধির ফলে জনগণের ওপর যে প্রভাব পড়বে তা স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি সাধারণ মানুষের কষ্ট বুঝতে পারছি। সামনে অন্য কোনো বিকল্প পথ না থাকায় এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এবং এর জন্য আমি জনগণের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। কোনো অসাধু মহল যাতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে বা পরিবহন ভাড়া অযৌক্তিকভাবে বাড়াতে না পারে, সে জন্য সরকার সতর্ক রয়েছে। সড়ক ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার এই ঋণ নেয়নি। অতীতে নেওয়া ঋণের শর্তগুলোর বিষয়টি সরকার পর্যালোচনা করে দেখবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, এখন থেকে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হবে। রোববার রাতেই এই নতুন দাম কার্যকর করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে সরকারকে জ্বালানি খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে এ ধরনের ভর্তুকির চাপ কমানো প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা কোভিড-১৯ মহামারি কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের পরিস্থিতির চেয়েও ভিন্ন ও জটিল।

