টেস্টে প্রথম বাংলাদেশি পেসার হিসেবে ৫টি ৫ উইকেটের রেকর্ড হাসানের

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় দিনে ইতিহাস গড়ে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়ে নিলেন ডানহাতি ফাস্ট বোলার হাসান মাহমুদ। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি পেসার হিসেবে পাঁচবার এক ইনিংসে ৫টি করে উইকেট নেওয়ার অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেছেন তিনি।

বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের ইতিহাসে এর আগে শাহাদাত হোসেন চারবার এবং রবিউল ইসলাম দুবার এক ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার করেছিলেন। বর্তমান প্রজন্মের বোলারদের মধ্যে কেবল নাহিদ রানা একাধিকবার (দুবার) এই অর্জন নিজের নামে করতে পেরেছেন। ম্যাচের দ্বিতীয় দিনে ক্যারিবিয়ানদের বিপক্ষে ৬ উইকেট তুলে নিয়ে এই ঐতিহাসিক তালিকায় সবাইকে ছাপিয়ে যান ২৭ বছর বয়সী এই পেসার।

ঘরের মাঠে প্রথম ৫ উইকেটের স্মৃতি ও পূর্ববর্তী কীর্তি

বাংলাদেশের মাটিতে এটিই হাসান মাহমুদের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকারের ঘটনা, যা তার এই অর্জনকে আরও বিশেষ করে তুলেছে। এর আগে দেশের বাইরে তিনি যে চারটি পাঁচ উইকেট পেয়েছিলেন, সেগুলো হলো

  • পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে (২০২৪)
  • ভারতের বিপক্ষে চেন্নাইয়ে (২০২৪)
  • অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইনে (২০২৬)
  • আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবু ধাবিতে (২০২৬)

চলতি ২০২৬ সালে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা হাসান মাহমুদ এ নিয়ে কেবল এই এক বছরেই তিনটি ৫ উইকেট শিকার করলেন। সিলেট টেস্টের একাদশে মাত্র দুজন পেসার নিয়ে মাঠে নামায় অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। তবে সকালে দ্বিতীয় নতুন বল হাতে পাওয়ার পর হাসান অধিনায়কের আস্থার প্রতিদান দারুণভাবে দেন।

আমির জাঙ্গু ও রোস্টন চেজকে আউট করার ছক

সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে উইকেটে জমে যাওয়া আমির জাঙ্গুকে আউট করতে চমৎকার কৌশল অবলম্বন করেন হাসান। তিনি উইকেট-রাউন্ড এসে বড় ইনসুইঙ্গার বোলিং করতে শুরু করেন। ক্রিজ ব্যবহার করে বিভিন্ন এঙ্গেল তৈরি করে বাঁহাতি এই ব্যাটারকে দ্বিধায় ফেলে দেন। অবশেষে হাসানের একটি লেংথ বল ভেতরে ঢুকেই উইকেট গুঁড়িয়ে দেয়। আগের দিনের চেয়ে উইকেটে কিছুটা ফুল লেংথে বল করছিলেন তিনি, যার সুফল মিলেছে সঙ্গে সঙ্গেই। জাঙ্গুকে ফেরানোর পরের বলেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক রোস্টন চেজকে ডিফেন্স করার সময় এজ করিয়ে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন হাসান মাহমুদ।

হ্যাটট্রিক সুযোগ ও লিটনের স্টাম্পিংয়ে ঐতিহাসিক উইকেটের গল্প

এর আগে আবু ধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টের আগের ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করার স্বাদ পেয়েছিলেন হাসান। শুক্রবারও তার সামনে টানা দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে আবারও হ্যাটট্রিকের সুযোগ এসেছিল। তবে ক্রিজে আসা নতুন ব্যাটার জোশুয়া বিশপ অন-ফিল্ড আম্পায়ার আসিফ ইয়াকুবের মাধ্যমে এলবিডব্লিউ আউট হলেও ডিআরএস (DRS) নিয়ে বেঁচে যান। তিন ওভার পর নিজের বোলিংয়ে বিশপের সহজ ক্যাচ মিস করেছিলেন হাসান। তবে পরবর্তীতে উইকেটরক্ষক লিটন দাসের এক অসাধারণ স্টাম্পিংয়ে নিজের ৫ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি।

লিটন দাস এই ওভারে উইকেটের একদম কাছে ঘেঁষে দাঁড়ান। এর ফলে বাংলাদেশি টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো পেস বোলারের বলে স্টাম্পিংয়ের মাধ্যমে উইকেট নেওয়ার রেকর্ড তৈরি হয়। ম্যাচ শেষে এই কৌশল নিয়ে হাসান বলেন, “আমির জাঙ্গু যখন ব্যাটিং করছিলেন, তখন তিনি ক্রিজ ছেড়ে সামনে বেরিয়ে এসে শট খেলছিলেন। পরে শান্ত ভাই (অধিনায়ক) আমাকে বলেন, লিটন যদি স্টাম্পের একদম কাছে দাঁড়ায়, তাহলে হয়তো ব্যাটার এত পা বাড়াতে পারবে না এবং শট খেলার প্রবণতাও কিছুটা কমে যাবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “তখন আমি দাদাকে (লিটন) বলি, তুমি যদি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করো, তবে অবশ্যই আমরা তোমার ও অধিনায়কের পরিকল্পনা অনুসারেই বল করব। পরে তিনি উইকেটের কাছে আসেন এবং আমাদের চমৎকার পরিকল্পনাটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়।”

ঘরের মাঠের সাফল্য ও বিরাট কোহলির উইকেটের আবেগ

ঘরের মাঠে নিজের প্রথম পাঁচ উইকেট নেওয়া প্রসঙ্গে হাসান মাহমুদ বলেন, “নিজের দেশে পাঁচ উইকেট পাওয়া আমার জন্য সবসময় খুব স্পেশাল। আমি বোলিংয়ের সময় সাধারণ বিষয়গুলো ঠিক রাখার চেষ্টা করি। তবে আগামীতে আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য আমি অবশ্যই কঠোর চেষ্টা চালিয়ে যাব।” নিজের ক্যারিয়ারে পাওয়া সব উইকেটের মধ্যে ভারতের কিংবদন্তি ব্যাটার বিরাট কোহলির উইকেটটি তার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সিলেটের উইকেট প্রসঙ্গে হাসান জানান, প্রথম দুই ঘণ্টা পেসারদের জন্য কন্ডিশন দারুণ সহায়ক ছিল। “প্রথম এক-দুই ঘণ্টা পেস বোলারদের জন্য এখানে অনেক সুবিধা ছিল। উইকেটে সিম মুভমেন্ট ছিল, সুইংও মিলছিল। তবে দুই ঘণ্টা পার হওয়ার পর উইকেট সম্পূর্ণ ফ্ল্যাট এবং ব্যাটিংবান্ধব হয়ে ওঠে। তবুও আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি যে আমাদের প্রক্রিয়া ও পরিকল্পনা কী হবে। দলের প্রতি অবদান রাখতে প্রতিটি বোলারই নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।”

পুরোনো ও নতুন বলে বোলিং পরিকল্পনা নিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, “নতুন বল এবং পুরোনো বলের জন্য আমাদের আলাদা আলাদা পরিকল্পনা থাকে। নতুন বলে আমরা যতটা সম্ভব ফুল লেংথে অফ-স্টাম্পের ওপর বল রাখার চেষ্টা করি। সেসময় সিম মুভমেন্ট ও সুইং থাকে। কিন্তু বল পুরোনো হয়ে গেলে রান আটকানো এবং ডিসিপ্লিন বজায় রাখা প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। তখন হয়তো আমরা সব সময় আক্রমণাত্মক থাকি না, রক্ষণাত্মকভাবে বোলিং করি।”