ঢালিউডের কালজয়ী অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক কেবল নিজের অভিনয় শৈলী দিয়ে রূপালি পর্দা মাতিয়ে রাখেননি, বরং একাধারে বহু প্রজন্মের জন্য ছিলেন পথপ্রদর্শক ও অভিভাবক। চলচ্চিত্রের এই মহানায়কের স্নেহধন্য হওয়া গুণী মানুষেরা আজও তাঁকে পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় মনে করেন। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড হ্যান্ডেলে এক আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে প্রয়াত এই অভিনেতার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ও পথচলার চমৎকার কিছু মুহূর্ত তুলে ধরেছেন দেশের নন্দিত সংগীতশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা।
সেই স্মৃতিচারণে কনকচাঁপা জানান, ১৯৮৬ সালে এক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো নায়করাজের মুখোমুখি হন তিনি। সে সময় তরুণ এই শিল্পীর নাম জিজ্ঞেস করে রাজ্জাক অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, কীভাবে এতটুকু বয়সে এত চমৎকার গান গাইলেন এবং চলচ্চিত্রে কণ্ঠ দিয়েছেন কি না। মহানায়ককে চোখের সামনে দেখে কনকচাঁপা এতটাই অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন যে কোনো উত্তর দিতে পারেননি। এরপর একটি প্লেব্যাক রেকর্ডিংয়ের সময় তাঁদের আবার দেখা হয়। সেদিন রাজ্জাক তাঁকে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, তিনি জানতেন এই স্থানটি কনকচাঁপারই হবে এবং এটি নিজের করে নেওয়ার জন্য অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে রাজ্জাক যতগুলো চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন, তার প্রায় সব ছবিতেই গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন কনকচাঁপা। তাঁকে ভালোবেসে ‘কনাচাঁপা’ এবং তাঁর স্বামীকে ‘জামাইবেটা’ বলে ডাকতেন রাজ্জাক, যা যেন এক পরম আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল।
স্মৃতির পাতা হাতড়ে এই সুকণ্ঠী গায়িকা আরও বলেন, তিনি মনে মনে আফসোস করতেন যদি রাজ্জাক-কবরী জুটির সোনালী সময়ে গান গাইতে পারতেন। একদিন এই ভাবনা থেকে রাজ্জাককে তা বলতেই তিনি রসিকতা করে উল্টো উত্তর দেন যে, তাঁদের সময়ে যদি কনকচাঁপাকে পাওয়া যেত তবে কতই না ভালো হতো। এই কথা শুনে আপ্লুত হয়ে কনকচাঁপা তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করতে গেলে রাজ্জাক হেসে উঠে বলেছিলেন, ‘এ মেয়ে তো পাগলি আছে!’ তিনি আরও মনে করেন, এত বড় মাপের একজন মানুষ হয়েও রাজ্জাক ছিলেন অত্যন্ত সহজ-সরল। রেকডিংয়ের সময় তিনি সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে খেতেন এবং কনকচাঁপা ভাত না খেলে তাঁর জন্য কাবাব আনিয়ে খাওয়ার জন্য জেদ করতেন।
পরিবার নিয়ে পথচলা ও ব্যক্তিগত জীবনেও রাজ্জাক কতটা মার্জিত ছিলেন, তা উল্লেখ করে এই শিল্পী বলেন, নায়করাজ সবসময় পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে চলতেন এবং তাঁর সন্তানদের চমৎকার আচার-ব্যবহার দেখলেই বোঝা যেত তাঁরা কত ভালো শিক্ষায় বড় হয়েছেন। শেষ বয়সে রাজ্জাক কিছুটা গম্ভীর ও চুপচাপ হয়ে গেলেও তাঁর সুন্দর হাসিটি ছিল আগের মতোই অমলিন, যা তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। বাংলা চলচ্চিত্রে রাজ্জাকের অনন্য অবদানের কথা স্মরণ করে কনকচাঁপা যুক্ত করেন, এই মহানায়কের অভিনয়শৈলী কোনো বাঙালি কোনোদিন ভুলতে পারবে না। দেশের চলচ্চিত্রকে একটি মজবুত অবস্থানে দাঁড় করাতে তিনি নিজের সমস্ত মেধা ও শক্তি উজাড় করে দিয়েছেন। পরিশেষে মহানায়কের আত্মার শান্তি কামনা করে পরপারে তাঁর জন্য শুভকামনা জানান এই গুণী গায়িকা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: টুক করে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতেই বললেন ‘এ মেয়ে তো পাগলি আছে ‘।

