পুনরুদ্ধারের পথে ওজোনস্তর: ২০৪০ সালের মধ্যে স্বাভাবিকের আশা

পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ওজোনস্তর এখন পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে। ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘মন্ট্রিল প্রটোকল’ বাস্তবায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলের এই গুরুত্বপূর্ণ স্তরটি ক্রমশ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে। ওয়ার্ল্ড মিটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, সব ঠিক থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী ওজোনস্তর ১৯৮০ সালের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।

প্রতিবছর ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ওজোন দিবস পালিত হয়। ওজোনস্তরের গুরুত্ব এবং এর ক্ষয়জনিত ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৪ সালে এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক ওজোনস্তর সুরক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘গ্লোবাল অ্যাকশন ফর এ কুলার প্ল্যানেট’ বা পৃথিবীকে শীতল রাখতে বৈশ্বিক উদ্যোগ।

বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ৯০ শতাংশ ওজোন গ্যাস ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৫ থেকে ৩৫ কিলোমিটার ওপরে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে অবস্থান করে। এই পাতলা স্তরটি সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির বড় একটি অংশ শোষণ করে আমাদের রক্ষা করে। বিজ্ঞানীরা গণনা করে দেখেছেন, বায়ুমণ্ডলের সব ওজোন গ্যাসকে যদি ভূপৃষ্ঠে নামিয়ে আনা হতো, তবে তার পুরুত্ব হতো মাত্র ৩ মিলিমিটার। এই সামান্য স্তরটি না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ত।

১৯৯২ সালে প্রথম ওজোনস্তর ক্ষয়ের মারাত্মক চিত্র বিজ্ঞানীদের সামনে আসে। এর পর থেকে গবেষণায় দেখা গেছে যে, সিএফসি বা ক্লোরোফ্লোরোকার্বনের মতো ক্ষতিকর পদার্থের ব্যবহার কমিয়ে আনায় ওজোনস্তরের ক্ষত অনেকটা সেরে উঠছে। গত বছর বা ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টার্কটিকার ওজোন গহ্বরটি গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ক্ষুদ্রতম আকারে ছিল। টানা দ্বিতীয় বছর ওজোন গহ্বরের আকার ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের গড় মাপের চেয়ে ছোট পাওয়া গেছে, যা ইতিবাচক সংকেত বহন করে।

তবে পুনরুদ্ধারের এই প্রক্রিয়াটি সব অঞ্চলে সমান নয়। ডব্লিউএমওর প্রাক্কলন অনুযায়ী, আর্কটিক অঞ্চলে ওজোনস্তর স্বাভাবিক হতে ২০৪৫ সাল এবং অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে ২০৬৬ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এছাড়া নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থেকে ওজোন ক্ষয়কারী উপাদানের অপ্রত্যাশিত নির্গমন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা উদ্বেগের কারণ। বিশেষ করে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সিএফসি-১১ এবং মাঝেমধ্যে হাইড্রোফ্লোরোকার্বন (এইচএফসি)-২৩ গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

গবেষকেরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, ক্ষতিকর পদার্থের অতিরিক্ত নির্গমন অব্যাহত থাকলে মধ্য অক্ষাংশে ওজোনস্তর স্বাভাবিক হতে প্রায় ৭ বছর দেরি হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এই বিলম্ব ৬ থেকে ১১ বছর পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিজ্ঞানীরা আরও উল্লেখ করেছেন, একটিমাত্র ক্লোরিন পরমাণু বায়ুমণ্ডল থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগে ১ লাখের বেশি ওজোন অণু ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে। তাই ওজোনস্তর রক্ষায় কোনো ধরনের শৈথিল্য দেখানোর সুযোগ নেই।

পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো নিয়েও বিজ্ঞানীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আগে যেখানে প্রায় ১৩০টি সক্রিয় স্টেশন ওজোন পর্যবেক্ষণ করত, এখন তা কমে ১১০টিতে নেমে এসেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকার পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যদিও এখন বায়ুদূষণ মাপার জন্য নতুন প্রজন্মের অ্যারে স্পেকট্রোমিটার ব্যবহার করা হচ্ছে, তবুও ওজোনস্তরের সঠিক সুরক্ষার জন্য পুরনো পর্যবেক্ষক কাঠামোর সংস্কার ও শক্তিশালী করা জরুরি।

ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো এই পরিস্থিতিকে একটি বড় পরিবেশগত সাফল্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ২০০০ সাল থেকে ওজোনস্তরের ঘুরে দাঁড়ানোর যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা চলমান রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা। স্যাটেলাইট ডেটা ও মডেল সিমুলেশনে ২০০৫ সাল থেকেই ওজোনস্তরের উন্নতির স্পষ্ট প্রমাণ মিলছে। ২০৪০ সাল নাগাদ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে প্রটোকলের প্রতিটি শর্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ পৃথিবীর প্রাণ ও প্রকৃতির জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ওজোনস্তরের ক্ষয় এবং এটির ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে প্রতিবছর ১৬ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালন করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওজোনস্তরের গুরুত্ব, এটির ক্ষয়জনিত ঝুঁকি ও পরিবেশ রক্ষায় করণীয় বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরাই দিবসটি পালনের মূল উদ্দেশ্য। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশাপাশি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের কথাও বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর পর থেকে যতবার ওজোন গহ্বর মাপা হয়েছে, তার মধ্যে গত বছরের গহ্বরটি ছিল তালিকায় চতুর্থ বা পঞ্চম ক্ষুদ্রতম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বছরভিত্তিক এ পরিবর্তনের পেছনে আবহাওয়া বড় ভূমিকা পালন করছে বলে ধারণা করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অতীতে ফ্রিজ কিংবা অগ্নিনির্বাপক ফোমে যে ক্লোরোফ্লোরোকার্বন বা সিএফসি ব্যবহার করা হতো, এ চুক্তির মাধ্যমে তা সফলভাবে পর্যায়ক্রমে অনেকটাই কমিয়ে আনা গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ডব্লিউএমও গ্লোবাল অ্যাটমোস্ফিয়ার ওয়াচ নেটওয়ার্ক নিয়মিতভাবে ওজোনস্তরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ও গবেষকদের নির্ভরযোগ্য তথ্য দিয়ে সহায়তা করে।