ফরাসি কিংবদন্তি থিয়েরি অঁরি উসমান দেম্বেলেকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘ফর্ম আসে যায়, পরিসংখ্যানের গ্রাফও ওঠানামা করে, কিন্তু জাত চিরস্থায়ী। উসমান দেম্বেলে সবাইকে আরও একবার মনে করিয়ে দিলেন, তিনি আসলে কে!’
বিশ্বকাপ শুরুর আগে সর্বশেষ ব্যালন ডি’অরজয়ী হিসেবে দেম্বেলের একটি বড় পরিচয় ছিল। তবে বিশ্বকাপে লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হলান্ডরা যখন একের পর এক গোল করে যাচ্ছিলেন, তখন যেন সবাই তাঁর সেই পরিচয় ভুলতে বসেছিলেন!
বিষয়টি অবশ্য অবাক করার মতো নয়। বড় টুর্নামেন্টে দেম্বেলেকে খুঁজে পাওয়া যায় না, এমনটা সবারই জানা ছিল।
গ্রুপ পর্বে ইরাকের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে ১৯ ম্যাচে দেম্বেলের কোনো গোল ছিল না। ফ্রান্সের জার্সিতে বড় টুর্নামেন্টে দেম্বেলে যেন গ্রীষ্মকালীন খরার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন! ইরাক ম্যাচে অবশ্য এক ফোঁটা ‘বৃষ্টি’ নেমেছিল (এক গোল)। কিন্তু সেই এক ফোঁটা যে প্লাবনের সংকেত ছিল, তা কে জানত!
অঁরি কি আগেই এই প্লাবনের আভাস পেয়েছিলেন? নইলে দেম্বেলের মূল পরিচয়টা তিনি কেন মনে করিয়ে দেবেন! সেই পরিচয়টি হলো তাঁর ‘ভার্সেটিলিটি’—গতি, ড্রিবলিং, শৈলী এবং সব্যসাচী পা। বোস্টনে নরওয়ের রক্ষণভাগের ক্যানভাসে দেম্বেলে যে ‘মাস্টারপিস’ এঁকেছেন, তার শিরোনাম হতে পারে, ‘জীবন শুধু গ্রীষ্মের নয়, বর্ষাও নামে।’
খরায় ফেটে চৌচির মাটিতে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি দেখতে যেমন প্রশান্তি লাগে, নরওয়ের জালে দেম্বেলের গোলগুলো ছিল তেমনই সুন্দর। মাত্র ৩২ মিনিটে আঁকা সেই ‘মাস্টারপিস’ দেখে অঁরি যেমন মন্তব্য করেছেন, ‘গ্রেট খেলোয়াড়েরা মুহূর্তের অপেক্ষায় থাকেন না, তাঁরা মুহূর্ত তৈরি করেন। ভালো খেলোয়াড় ও বিশ্বমানের খেলোয়াড়ে এটাই পার্থক্য।’
জ্যাকসন পোলক বিমূর্ত ছবির কিংবদন্তি। নরওয়ের বিপক্ষে দেম্বেলের হিট–ম্যাপ দেখলে পোলকের কোনো বিমূর্ত ছবির মতোই মনে হয়। কিন্তু ক্যামেরায় যখন তাঁর সেই আঁকিবুঁকি (দৌড়) ছবির ভাষায় ফুটে উঠেছে, তখন ধারাভাষ্যকারই বলে উঠেছেন, ‘লাইক আ মাস্টার আর্টওয়ার্ক।’
অথচ দেম্বেলের সব কটি গোলের ধরনই সবার খুব পরিচিত। অতীতে বার্সেলোনার হয়ে কিংবা এখন পিএসজির জার্সিতে তিনি ঠিক এভাবেই খেলেন। ৭ মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পের পাস থেকে তাঁর প্রথম গোলটি ছিল বক্সের ভেতরে বাঁ পায়ে স্ট্রাইকারদের ‘ট্রেডমার্ক’ গোল। ১৩ মিনিট পর দ্বিতীয় গোলটি ছিল উইঙ্গারসুলভ। এবারও আড়াআড়ি পাসদাতা ছিলেন এমবাপ্পে—বাঁ প্রান্ত দিয়ে কাট–ইন করে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া বাঁকানো শটে তিনি গোলটি করেন। ৩২ মিনিটের গোলটিও বাঁ পায়ে, এবার বক্সের ভেতরে ডিফেন্ডারদের একটু নাচিয়ে তিনি জালে বল জড়ান।
দেম্বেলের ৩২ মিনিটের এই শিল্পকর্ম আপনার মনে বার্সেলোনার লিওনেল মেসির দিনগুলোকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারে। কিংবা আরিয়েন রোবেনকেও। অনেকে ওভাবে গোল করাকে তাঁদের ‘ট্রেডমার্ক’ মনে করলেও, এই লাইসেন্স যে দেম্বেলেরও রয়েছে, তা অনেকে ভুলে যান। শুধু কি তাই, ফ্রান্স–নরওয়ে ম্যাচকে এমবাপ্পে–হলান্ডের দ্বৈরথ হিসেবে দেখা হয়েছিল। দেম্বেলেও যে আছেন, পার্থক্য গড়ে দেওয়ার ক্ষমতা যে তাঁর এমবাপ্পের চেয়ে কম নয়—সেটা মনে ছিল কজনের!
সবাই জানে এমবাপ্পের শক্তির জায়গা ডান পা। দেম্বেলেরটা কেউ জানেন না। গুঞ্জন আছে, দেম্বেলে নিজেও জানেন না, তাঁর কোন পা বেশি শক্তিশালী! দেম্বেলে বাঁ পা–টা বেশি ব্যবহার করেন। অর্থাৎ তাঁর সেই চিরাচরিত ‘তুলি’তেই নতুন করে সেজেছে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের ইতিহাস।
ম্যাচের শুরু থেকে হিসাব করলে দেম্বেলের ৩২ মিনিটের হ্যাটট্রিকটি বিশ্বকাপের ইতিহাসেই দ্বিতীয় দ্রুততম। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে সাবেক চেকোস্লোভাকিয়ার বিপক্ষে ২৪ মিনিটে হ্যাটট্রিক করেছিলেন অস্ট্রিয়ার সাবেক স্ট্রাইকার এরিক প্রবস্ট। সেই হিসাবে দেম্বেলের হ্যাটট্রিক বিশ্বকাপে গত ৭২ বছরের মধ্যে দ্রুততম। ম্যাচে যেকোনো সময় নেমে বিশ্বকাপে দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ড হাঙ্গেরির লাসলো কিসের—১৯৮২ বিশ্বকাপে এল সালভাদরের বিপক্ষে বদলি নেমে ৭ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের মধ্যে তিনি এই কীর্তি গড়েন।
কিন্তু দেম্বেলের সম্ভবত রেকর্ড নিয়ে মাথাব্যথা নেই। নরওয়ে ম্যাচের পর তাঁর কথা শুনলে অবাক হতে হয়, ‘ভালো লাগছে। আমার জন্য বিশেষ মুহূর্ত। তবে ইরাক ও সেনেগালের বিপক্ষে নিজের পারফরম্যান্সই বেশি পছন্দ। আমার প্রভাব অনেক বেশি ছিল।’
সেটা দেম্বেলের ব্যক্তিগত মতামত। রেকর্ড তো আর তা মানে না। রেকর্ড বলছে, ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ক্যামেরুন–রাশিয়া ম্যাচে একাই ৫ গোল করেছিলেন ওলেগ সালেঙ্কো। তার মধ্যে প্রথমার্ধেই করেছিলেন হ্যাটট্রিক। দেম্বেলের হ্যাটট্রিকটি তারপর বিশ্বকাপের ম্যাচে প্রথমার্ধে করা প্রথম হ্যাটট্রিক। মজার বিষয়, সালেঙ্কোর সেই কীর্তি গড়ার ৩২ বছর পূর্তি হবে আগামীকাল!
আসলে দেম্বেলের হয়তো ইতিহাসে আগ্রহ নেই। নইলে তিনি জানতেন, বিশ্বকাপে তিনি এখন ব্যালন ডি’অরজয়ী হিসেবে হ্যাটট্রিক করা চতুর্থ খেলোয়াড়। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে ইউসেবিও, ১৯৮২ বিশ্বকাপে চিলির বিপক্ষে রুমেনিগে এবং ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর এবার দেম্বেলে এই তালিকায় যুক্ত হলেন।
সেই দেম্বেলে, যাঁর ভেতরটা নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে দেখা গেল।
শুধু স্ট্রাইকারের আদলে গড়া নয়, উইঙ্গার, মিডফিল্ডারের চুন–সুরকিও আছে তাঁর ভেতরে। সেসব মিলিয়েই তো নরওয়ে ম্যাচে আবির্ভূত হলেন আসল দেম্বেলে। তাতে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন কে, জানেন?
কিলিয়ান এমবাপ্পে। দেম্বেলেকে দুবার কোলে তুলে নেন এই কিংবদন্তি।
দেম্বেলে–এমবাপ্পের আলোয় শেষ ৩২ দলের রাউন্ডে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ দলের ডিফেন্ডারদের কি ঘুম হবে?
এমবাপ্পে ও দেম্বেলের এখন সমান ৪ গোল। কী হতে পারে, সেটাও বলে দিয়েছেন অঁরি, ‘পরের ম্যাচে যদি ডিফেন্ডার হিসেবে আমাকে দেম্বেলের মুখোমুখি হতে হতো, তাহলে খুব দুশ্চিন্তায় ভুগতাম।’
সেটাই তো! এই দেম্বেলে তো কিছু জায়গায় এমবাপ্পের চেয়েও ধারালো। যেমন রক্ষণ–জাল কাটতে পারেন, তেমনি গোল করতেও।
