বিশ্ব ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপ: বানরের উপদ্রব রুখতে মাঠে ‘মাঙ্কি হুইস্পারার

নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী ইনডোর স্টেডিয়ামে বিশ্ব ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের আসর বসতে চলেছে। বিশ্বের সেরা শাটলাররা যখন দিল্লিতে জড়ো হচ্ছেন, তখন আয়োজকদের নজর কেবল খেলার মাঠের দিকেই নয়, বরং স্টেডিয়ামের আশেপাশে ওত পেতে থাকা বানরের দলের দিকেও রয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দিতে চার সদস্যের একটি বিশেষ দল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের স্থানীয়ভাবে ‘মাঙ্কি হুইস্পারার’ বা বানর তাড়ানোর বিশেষজ্ঞ বলা হচ্ছে।

৬৫ বছর বয়সী নজর খান এই দলের অন্যতম সদস্য। সোমবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বড় ইভেন্টে রিসাস ম্যাকাক প্রজাতির বানর যাতে কোনোভাবেই স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকে পড়তে না পারে, তা নিশ্চিত করাই তাদের মূল দায়িত্ব। স্টেডিয়ামটির অতীত রেকর্ড খুব একটা সুখকর নয়। গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া ওপেনের সময় গ্যালারিতে বানর দেখা গিয়েছিল। এছাড়া পাখির বিষ্ঠা ও বাসা তৈরির কারণে খেলার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ায় আয়োজকদের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল।

সেই বিব্রতকর পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবার আয়োজকরা ‘মাঙ্কি ওয়াল্লাহ’ বা বানর তাড়ানোর কৌশল অবলম্বন করেছেন। এরা মূলত ল্যাঙ্গুর বা হনুমানের ডাক নকল করে ছোট প্রজাতির বানরদের ভয় দেখিয়ে দূরে সরিয়ে রাখে। নজর খান এএফপি-কে জানান, তাদের পরিবার বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। শুরুতে তারা বানর ও ভাল্লুকের খেলা দেখাতেন, কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞার পর সেই পেশা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর জীবিকার তাগিদে তারা বানর তাড়ানোর এই নতুন পথ বেছে নেন।

হিন্দুপ্রধান ভারতে বানরদের অনেকে শ্রদ্ধার চোখে দেখলেও, রাজধানীতে এরা বড় ধরনের উপদ্রব হিসেবে পরিচিত। বাগান, অফিস ও আবাসিক এলাকায় এরা প্রায়ই তাণ্ডব চালায় এবং খাবারের জন্য মানুষকে আক্রমণও করে। এক সময় প্রশিক্ষিত কালোমুখো ল্যাঙ্গুর ব্যবহার করে বানর তাড়ানো হতো, কিন্তু আইনি জটিলতায় সেই প্রথাও এখন নিষিদ্ধ। ফলে নজর খানের মতো পরিবারগুলো এখন কেবল অভিজ্ঞতা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং বিভিন্ন প্রাণীর ডাক নকল করেই এই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

নজর খান জানান, স্টেডিয়াম চত্বরে বর্তমানে তিন-চারটি বানর এবং দুটি বেশ বড় আকারের বানর ঘোরাফেরা করছে, যা খেলোয়াড়দের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তিনি বলেন, আমরা এমন কিছু বিশেষ শব্দ করি যা বানরদের ভয় পাইয়ে দেয়। আমাদের কাজের পরিধি শুধু বানর তাড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। স্টেডিয়াম চত্বরে ঢুকে পড়া পথ কুকুরদেরও আমরা নিরাপদভাবে বাইরে বের করে দিই। আমরা নিশ্চিত করি যে কোনো প্রাণীরই যেন ক্ষতি না হয়। নজর খান গর্বের সঙ্গে জানান, তার নাতিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কার্যালয়ে বানর তাড়ানোর কাজে নিয়োজিত একটি দলের সদস্য।

নজর খানের ভাইপো ও সহকর্মী ফরিয়াদ আলি তাদের কাজের কৌশল প্রদর্শন করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের চিৎকার ও গর্জন করে দেখান। এই কাজের ঝুঁকি সম্পর্কে ফরিয়াদ আলি জানান, পেশাগত কারণে তাদের প্রায়ই বানরের কামড় খেতে হয়। তিনি তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কামড়ের দাগ দেখিয়ে বলেন, এটি আমাদের কাজেরই অংশ। কামড় খেলে আমরা কোনো ইনজেকশন বা চিকিৎসার ধার ধারি না, কেবল ক্ষতস্থানে মরিচের গুঁড়ো লাগিয়েই আবার কাজে নেমে পড়ি।

এদিকে, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ‘মাঙ্কি হুইস্পারার’ নিয়োগের খবরটি অনলাইনে কিছুটা হাস্যরসের জন্ম দিলেও, ভারতের তারকা শাটলার ও অলিম্পিক পদকজয়ী পিভি সিন্ধু এই উদ্যোগের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, এই সমাধান নিয়ে কেউ হাসাহাসি করতে পারেন, কিন্তু আয়োজকদের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতেই হবে। সিন্ধু এই ব্যবস্থাকে উইম্বলডনের সঙ্গে তুলনা করেন, যেখানে ঘাসের কোর্ট থেকে কবুতর তাড়াতে দীর্ঘকাল ধরে বাজপাখি ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি বড় ক্রীড়া ইভেন্টের নিজস্ব স্থানীয় চ্যালেঞ্জ থাকে। এটি কেবল অতিরিক্ত একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা মাত্র।

টুর্নামেন্ট আয়োজকরা জানিয়েছেন, এই বিশেষ বাহিনী তাদের সামগ্রিক পরিকল্পনার একটি অংশ মাত্র। স্টেডিয়ামের ছাদ ও পাইপের ওপর এক ধরনের বিষমুক্ত জেল লাগানো হয়েছে, যাতে কবুতর সেখানে বসতে না পারে। ব্যাডমিন্টন অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার সেক্রেটারি সঞ্জয় মিশ্র জানান, তারা কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আমি শতভাগ নিশ্চিত যে এই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালীন কবুতর বা অন্য কোনো প্রাণীজনিত সমস্যা আর হবে না।

সব মিলিয়ে, মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আয়োজকদের এই অভিনব উদ্যোগ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নজর খান ও তার দলের সদস্যরা এখন তাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে প্রস্তুত, যাতে কোনো অনাহুত অতিথি খেলোয়াড়দের মনোযোগ নষ্ট করতে না পারে।