একাকিনী মায়ের একমাত্র মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৩৪৬ টাকা কাবিনে। সেদিন পরিস্থিতি এমন ছিল যে বিয়ে প্রায় ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কারণ পরিবারের মা কিংবা ভাইবোন কেউই এই আয়োজনে রাজি ছিলেন না। আমার ভেতরের নারীবাদী সত্তা আর পারিবারিক প্রতিকূলতার সেই টানাপোড়েন আজও মনে দাগ কাটে। আমার নারীবাদী সত্ত্বার ভেতরে সনাতনী এক মা হঠাৎ করে বেঁকে বসল, মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবে বুকে সকাল থেকে ব্যথা শুরু হলো। সন্ধ্যায় কাবিন, সকল আয়োজন, সাজসজ্জা সম্পন্ন আর দুপুর দুইটা পর্যন্ত আমি কোরান, হাদিস, শরীয়াহ আইন, জজসাহেব, লইয়ার কনসালটেশন- এইসব করছি, এ বিয়ে হবে না বলে আমার ভাই থেকে থেকে হুঙ্কার দিচ্ছে। কিন্তু আমার মেয়ে আমার চেয়েও বাঁকা, সে এর চেয়ে বেশি কাবিনের টাকা নির্ধারণে রাজি না। বিয়ের পড়ানোর মাঝখানেও একটু ঝামেলা হলো কাজী সাহেব মায়ের নাম না বলায়। আমার মেয়ে বলল, ‘তুমি ফেইক নারীবাদী, বিশেষ বিশেষ সময় তুমি নিজেই টিপিক্যাল বাঙালী মা হয়ে যাও। হয়তো আমার গর্ব করা উচিত এই ভেবে যে আমার কন্যা প্রচলিত একটা প্রথা ভাঙতে চেয়েছে।
নদীর বিয়ের পর ইতিমধ্যে তিন মাস পার হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল আমাদের জীবনের অন্তহীন কষ্টের উপাখ্যান বুঝি এখানেই শেষ হলো। কিন্তু অজানা কারণে গত কয়েকদিন ধরে বুকের মধ্যে চিনচিন ব্যথা অনুভব করছি। নদী সেদিন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল, তুমি যেন অন্য সবার মতো নও।
পরিবার ও সমাজের নানা বাধা অতিক্রম করে মেয়ের এই বিয়ে সম্পন্ন করার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শেলী নাজ আরও উল্লেখ করেন যে, এই ৩৪৬ সংখ্যাটি আমাদের পারিবারিক জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। ৩৪৬ সংখ্যাটা আমাদের জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কোনো একটা টাকার অংক লিখতে হবে বলে এ সংখ্যাটা লিখতে হয়েছে।
পিতৃতন্ত্রের কাঠগড়ায় একজন ব্যর্থ মা হিসেবে আমাকে যারা দাঁড় করিয়ে দিতে চেয়েছিল, দিনশেষে আমি তাদের ক্ষমা করে দিই কিংবা না দিই, তাতে কিছু আসে যায় না। অক্ষমার্হ এই আমি এবং ভালোবাসা প্রকাশে চিরকালের অপারগ এই আমি আজ সত্যি আনন্দিত ও খুশি।
মা হিসেবে মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে সমস্ত প্রতিকূলতা পেরিয়ে আসাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই কঠিন মুহূর্তগুলো পার করে আজ মেয়ের নতুন জীবনের দিকে তাকিয়ে স্বস্তি মিলছে, যদিও মনের গভীরে রয়ে গেছে অতীতের কিছু গভীর ক্ষতের অনুভূতি।

