আমাদের পৃথিবী আগের মতোই আছে, কিন্তু এই নীল গ্রহকে দেখার প্রচলিত মানচিত্রে বড়সড় এক পরিবর্তনের ডাক এসেছে। সম্প্রতি টোগোর উদ্যোগে এবং আফ্রিকান ইউনিয়নের সমর্থনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ শিরোনামের এই প্রস্তাবটির পক্ষে ১৬৪টি দেশ ভোট দিলেও কেবল যুক্তরাষ্ট্র এর বিরোধিতা করেছে। এছাড়া এস্তোনিয়া, জর্জিয়া, লিথুয়ানিয়া, মলদোভা, সার্বিয়া ও ইউক্রেন ভোটদানে বিরত ছিল।
এই প্রস্তাব মূলত সম-আয়তনভিত্তিক বা ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে, যা প্রতিটি মহাদেশের প্রকৃত আয়তনকে সঠিক অনুপাতে তুলে ধরবে। বর্তমানে প্রচলিত মার্কেটর প্রজেকশনের মানচিত্রে উচ্চ অক্ষাংশের ভূখণ্ডগুলোকে অস্বাভাবিক বড় দেখায়। ১৫৬৯ সালে জেরারডাস মার্কেটর এটি তৈরি করেছিলেন মূলত সমুদ্রযাত্রায় দিকনির্দেশনা ঠিক রাখতে, ভূখণ্ডের আয়তন দেখাতে নয়। এর ফলে গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার সমতুল্য মনে হলেও বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
মানচিত্রের এই জ্যামিতিক কারসাজি কেবল একটি নকশা নয়, বরং এর সঙ্গে মিশে আছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও ঔপনিবেশিক প্রভাব। শৈশব থেকে যে মানচিত্র দেখে আমরা বড় হই, তাতে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো সুবিশাল এবং আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকা সংকুচিত। এটি অবচেতনভাবে মানুষের মনে বিশ্বশক্তির গুরুত্বের একটি অসম সমীকরণ তৈরি করে দেয়। ক্ষমতার চর্চা কেবল বন্দুকের নলে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং দৃষ্টিভঙ্গির ওপর কর্তৃত্ব স্থাপনের মাধ্যমেও তা বিস্তার লাভ করেছে।
ঔপনিবেশিক শাসকেরা সোনা-জহরত বা সম্পদের পাশাপাশি জ্ঞান ও সভ্যতার সংজ্ঞা নির্ধারণের মাধ্যমেও শোষণ চালিয়েছে। টমাস ব্যাংবিংটন মেকলের ১৮৩৫ সালের ‘মিনিট অন ইন্ডিয়ান এডুকেশন’ এর একটি বড় উদাহরণ। তিনি এমন একটি শিক্ষিত শ্রেণি তৈরির কথা বলেছিলেন, যারা রক্তে ভারতীয় হলেও রুচি ও বুদ্ধিবৃত্তিতে হবে পুরোপুরি ইংরেজ। এডওয়ার্ড সাইদ তাঁর ‘ওরিয়েন্টালিজম’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, প্রাচ্য সম্পর্কে পশ্চিমা জ্ঞান কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ক্ষমতাকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। ফ্রাঞ্জ ফানো আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন, উপনিবেশবাদ শাসিতের আত্মপরিচয়ে এমন আঘাত হানে যে, মানুষ নিজের মানমর্যাদা বিচার করতেও শাসকের চোখ ব্যবহার করে।
আজকের দিনে অর্থনৈতিক বৈষম্যের পেছনেও এই ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার কাজ করছে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ‘না’ ভোটটিকে বিশ্লেষকরা কেবল একটি মানচিত্র সংশোধন হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে তারা বৃহত্তর ‘আমূল মতাদর্শিক প্রকল্প’ ও ‘জ্ঞানগত ন্যায়বিচার’-এর বিতর্কের অংশ হিসেবে দেখছে। মানচিত্র এখন কেবল কাগজের টুকরা নয়, বরং তা বৈশ্বিক অসমতা ও ক্ষমতার লড়াইয়ের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
তবে কেবল ‘পশ্চিম’ বা ‘ধনী’ দেশগুলোর ওপর দোষ চাপালেই সত্য পূর্ণ হয় না। আফ্রিকান চিন্তাবিদ আশিল এমবেম্বে তাঁর ‘অন দ্য পোস্টকলোনি’ বইয়ে দেখিয়েছেন, স্বাধীনতা-উত্তর অনেক দেশে স্থানীয় অভিজাত শ্রেণি ও স্বৈরশাসকেরাও শোষণের একই ধারা অব্যাহত রেখেছে। তাই সমস্যাটি কেবল ‘সাদা’ ও ‘কালো’র বর্ণবাদী পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীনের লড়াই।
মানচিত্রে আফ্রিকাকে বড় দেখালে রাতারাতি মহাদেশটির দারিদ্র্য ঘুচবে না, কিন্তু এটি আমাদের ‘দেখার অভ্যাস’ বদলে দেবে। কয়েক শতাব্দী ধরে যারা অন্যের চোখ দিয়ে নিজেদের দেখছে, তাদের নিজস্ব দৃষ্টিতে বিশ্বকে দেখার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করাই এ পরিবর্তনের আসল লক্ষ্য। মূল প্রশ্ন হলো—আমরা কি শক্তিধরকে বড় এবং দুর্বলকে ছোট দেখতেই অভ্যস্ত থাকব? যদি আমাদের চিন্তার মানচিত্র থেকে এই বৈষম্য দূর না হয়, তবে কেবল কাগজের মানচিত্র বদলে কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সম্প্রতি আফ্রিকার দেশ টোগোর উদ্যোগে ও আফ্রিকান ইউনিয়নের সমর্থনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৬৪-১ ভোটে ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে সামান্যই বলতে হয়—একটি মানচিত্রের প্রজেকশন বদলানো মাত্র। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কে বা কারা সেই দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ দুটির চেয়েও গুরুতর জিজ্ঞাসা হলো, শক্তিধর ও বলহীন, কেন্দ্র ও প্রান্ত, ধনী ও গরিবের ধারণা কি শুধু রাজনীতি-সমাজনীতি-অর্থনীতিতে তৈরি হয়, নাকি আমাদের দেখাশোনা-বোঝাপড়াতেও তার ছাপ পড়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল নৌযাত্রায় দিকনির্দেশনা ও কম্পাস বিয়ারিং সঠিক রাখা, ভূখণ্ডের আসল বা সঠিক আয়তন দেখানো নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাই এটিকে সরাসরি ‘আফ্রিকাকে ছোট করার ঔপনিবেশিক ষড়যন্ত্র’ বললে ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এখানেই বিষয়টির গভীরতর দিকটিরও শুরু। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানচিত্র পৃথিবীর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলায় বড় ভূমিকা রাখে।

