রাজধানীজুড়ে গত কয়েক দিন ধরে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে, যার ফলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ায় রাস্তায় যানজট বাড়ছে এবং চালকদের কর্মঘণ্টার বড় একটি অংশ পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়েই কেটে যাচ্ছে। রাজধানীর মানিকনগরের বাসিন্দা ও সিএনজি চালক আরিফুল ইসলাম জানান, গত কয়েক দিন ধরে তার বাসায় রান্নার গ্যাস নেই। চুলা না জ্বলায় পুরো পরিবারকে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তিনি জানান, সকাল ৮টায় টিটিপাড়া এনএস সিএনজি ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়েও দুই ঘণ্টায় গ্যাস পাননি। ৩-৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ৭০-৮০ টাকার গ্যাস নিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে, যা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। একই স্টেশনের ক্যাশিয়ার আক্তারুজ্জামান জানান, গ্যাসের চাপ খুবই কম, মাঝে মাঝে সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
টিটিপাড়ার মতো একই চিত্র দেখা গেছে আশপাশের বেস্ট ইস্টার্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও শান্ত সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও। রাস্তার এক-তৃতীয়াংশ দখল করে যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাফিক সার্জেন্ট পলাশ আখতার জানান, গ্যাস নেওয়ার জন্য রাস্তা দখল করে দীর্ঘ লাইন করায় যানজট ও জনভোগান্তি কয়েক গুণ বেড়েছে। সোমবারও এই সংকট অব্যাহত ছিল। মালিবাগ হাজীপাড়ার সিটি ওভারসিজ সিএনজি স্টেশনে ‘গ্যাস নাই’ সাইনবোর্ড থাকলেও সামনে শতাধিক যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। এছাড়া খিলগাঁও, বনশ্রী, মুগদা ও সবুজবাগের স্টেশনগুলোতেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
যাত্রাবাড়ী ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এলাকায়ও গ্যাসের জন্য হাহাকার দেখা গেছে। মাতুয়াইল মাল্টিমিডিয়া সিএনজি ফিলিং অ্যান্ড কনভার্সন কোম্পানি এবং জয়কালি মন্দির রোডের এইচ এস এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড এলপিজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে গ্যাস নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। গ্যাসের অভাবে যাত্রাবাড়ী, কদমতলী ও মতিঝিলের অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে রান্নার চুলা জ্বলছে না। মিরপুর-১০, ১২, সেনপাড়া ও কালশী এলাকার সিএনজি স্টেশনগুলোতেও একই চিত্র। কালশীর শতাব্দী ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষমাণ মাইক্রো চালক বাশার জানান, দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাসের লাইনে কাটাতে হচ্ছে, ফলে আয় কমে গেছে।
উত্তরা ও বিমানবন্দর এলাকার স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর ও খিলক্ষেত এলাকার অধিকাংশ স্টেশন বন্ধ অথবা সরবরাহ নেই। সিএনজি চালক ইলিয়াস হোসেন জানান, চার-পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ৭০-৮০ টাকার বেশি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা শিমু বেগম জানান, গত তিন দিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত গ্যাস না থাকায় রান্নার কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে।
হাতিরঝিল সংলগ্ন মগবাজার, শাহবাগ, কলাবাগান, নিউমার্কেট, সেন্ট্রাল রোড ও কাঁঠালবাগান এলাকায়ও একই ভোগান্তি দেখা গেছে। গাড়িচালক আতিকুর রহমান জানান, ভোরে লাইনে দাঁড়িয়েও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মগবাজার ফিলিং স্টেশনে সিএনজি চালক সবুজ অভিযোগ করেন, এক ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ১০০ টাকা ঘুষ দিয়ে ৭০ টাকার গ্যাস নিতে হয়েছে। সিএনজির দৈনন্দিন খরচ মিটিয়ে সংসার চালানো এখন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাস সংকটের কারণে একদিকে যেমন পরিবহন খাতের চালকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, তেমনি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন রান্নাবান্নাও ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও গভীর রাতে বা ভোরে অল্প সময়ের জন্য গ্যাস মিললেও তা দিয়ে স্বাভাবিক রান্না সম্ভব হচ্ছে না। সব মিলিয়ে তীব্র গ্যাস সংকটে রাজধানীর সাধারণ মানুষ ও পরিবহন চালকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

