শাই হোপের অপরাজিত ১৬২ রানে ভারতকে হারিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের

নিউ পিসিএ স্টেডিয়ামের তীব্র গরমের মধ্যে পুরো ৫০ ওভার উইকেটরক্ষকের দায়িত্ব সামলান ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক শাই হোপ। কিন্তু এরপর সতীর্থ জুয়েল অ্যান্ড্রু আঙুলের চোটের কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় বাধ্য হয়েই হোপকে ইনিংসের গোড়াপত্তন করতে মাঠে নামতে হয়। সামান্য শারীরিক সমস্যা বা নিগল নিয়েও তিনি দলের হাল ধরে পুরো ৪৮.২ ওভার ক্রিজে লড়াই চালিয়ে যান। নিজের নামের প্রতি সুবিচার করে শেষ পর্যন্ত ১৬২ রানে অপরাজিত থেকে শনিবার ভারতকে ৫ উইকেটে হারিয়ে মাঠ ছাড়ে সফরকারীরা।

ভারতের দেওয়া ৩৫২ রানের পর্বতসম লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শাই হোপের এই দৃষ্টিনন্দন ইনিংসটি সাজানো ছিল ১৭টি চার এবং তিনটি ছক্কায়, যেখানে তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১১৩.২৯। এটি একদিনের ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার নতুন রেকর্ড এবং ২০২৩ সালের পর ভারতের বিপক্ষে তাদের প্রথম ওয়ানডে জয়। যদিও এই সান্ত্বনার জয়ের পরেও ভারত ৩ ম্যাচের এই সিরিজটি ২-১ ব্যবধানে নিজেদের করে নিয়েছে।

ইনিংসের শুরু এবং উদ্বোধনী জুটি

রান তাড়া করতে নেমে শাই হোপ ও জন ক্যাম্পবেল প্রথম ওভার থেকেই আক্রমণাত্মক শুরু করেন। প্রথম চার ওভারের মধ্যেই তারা দুজনে মিলে আটটি বাউন্ডারি আদায় করে নেন। তবে এই জুটি বেশি দূর এগোতে পারেনি। গুরনুর ব্রারের হাতে থার্ড ম্যানে জীবন পাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ক্যাম্পবেলকে ব্যক্তিগত ১০ রানে দুর্দান্ত এক ইনসুইঙ্গারে বোল্ড করে জুটি ভাঙেন মোহাম্মদ সিরাজ।

ক্যাম্পবেলের বিদায়ের পর হোপের সাথে যোগ দেন আমির জাঙ্গু। তিনি উইকেটে থিতু হয়ে সিরাজ এবং অভিষেককারী অংশুল কম্বোজের ওপর চড়াও হন। হোপ মাত্র ৪৬ বলে নিজের হাফ-সেঞ্চুরি পূর্ণ করার পর জাঙ্গুও নীতিশ কুমার রেড্ডিকে ছক্কা মেরে ৪৭ বলে অর্ধশতক স্পর্শ করেন। ১৮তম ওভারে এই দুই ব্যাটসম্যানের জুটি ১০০ রান অতিক্রম করে। ম্যাচে জাঙ্গুও কিছুটা ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছিলেন, পয়েন্টে বিরাট কোহলির হাতে তার ক্যাচ মিস হয়। এর মাধ্যমে তিনি ভারতের মাটিতে নিজের প্রথম তিনটি ওয়ানডে ইনিংসের প্রতিটিতেই পঞ্চাশোর্ধ্ব রান করার অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করেন।

ক্যারিবীয়দের উইকেট পতন ও হোপের অবিচল লড়াই

তাদের ১০৯ রানের জুটিটি ভেঙে যায় যখন রানআউটের শিকার হয়ে জাঙ্গু ৬৭ রানে বিদায় নেন। মিড-উইকেট থেকে বিরাট কোহলির সরাসরি থ্রো নন-স্ট্রাইকার প্রান্তের স্টাম্পে আঘাত করলে এই বিপর্যয় ঘটে। এরপর শেরফেন রাদারফোর্ড ২৪ রান করে অভিষেককারী নমন ধিরের বলে কট বিহাইন্ড হন, যদিও তিনি বল ব্যাটে লেগেছে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। তবে হোপ অন্য প্রান্ত আগলে রেখে একের পর এক ব্যাক-ফুট শটে মাঠ কাঁপিয়ে ৩৪তম ওভারে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ২১তম শতরান তুলে নেন। ভারতের বিপক্ষে এটি তার পঞ্চম এবং টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি।

ম্যাচে ভারতীয় দলের শরীরী ভাষা বেশ দুর্বল দেখায়। ২২তম ওভারের পর উইকেটরক্ষক লোকেশ রাহুল মাঠ ছাড়লে ধ্রুব জুরেল গ্লাভস হাতে নেন। অন্যদিকে পায়ের গোড়ালির চোটের কারণে মাঠ ছাড়তে হয় বোলার ব্রারকে। ম্যাচে দুই দল মিলিয়ে মোট ৯টি ক্যাচ মিস করে, যা ওয়ানডে ক্রিকেটে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ক্যাচ মিসের রেকর্ডের সমতুল্য।

শেষ ওভারের উত্তেজনা ও ঐতিহাসিক সমাপ্তি

চতুর্থ উইকেটে কিমো পলকে সাথে নিয়ে হোপ ৬৫ রান যোগ করেন। পল ৩৫ বলে ৫টি চারের সাহায্যে ৪৪ রানের এক ঝড়ো ইনিংস খেলে ব্রারের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। এরপর ম্যাথু ফোর্ড ৭ রান করে কুলদীপ যাদবের শিকার হন। শেষ ৭ ওভারে যখন জয়ের জন্য ৬৬ রান প্রয়োজন, তখন হোপ ব্যাটিংয়ের গতি বাড়িয়ে দেন। কুলদীপকে সুইপ করে চার এবং ৪৫তম ওভারে একটি ৮৩ মিটারের বিশাল ছক্কা মেরে দলের রান ৩০০ পার করান।

ম্যাচের ৪৮তম ওভারটি ভারতের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রমাণিত হয়। কম্বোজের বলে হোপ যখন ১৪৬ রানে খেলছিলেন, তখন বোলার ওভারস্টেপ করায় নো-বল হয়। হোপ ফ্রি-হিটে চার মারার পর গুড়াকেশ মোতিও দুটি চার মেরে ওই ওভার থেকে মোট ২২ রান তুলে নেন। শেষ ওভারে জয়ের সমীকরণ মেলাতে নমন ধিরকে স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে ছক্কা মেরে স্কোর সমান করেন হোপ। পরের বলে লং-অফে সিঙ্গেল নিয়ে ১০ বল হাতে রেখেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক স্মরণীয় জয় নিশ্চিত করেন তিনি।

সংক্ষিপ্ত স্কোরভারত ৫০ ওভারে ৩৫১/৭ (কেএল রাহুল ১২৯ অপরাজিত, রোহিত শর্মা ৯২; জেইডেন সিলস ৩-৬২, কিমো পল ২-৭১) বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৪৮.২ ওভারে ৩৫২/৫ (শাই হোপ ১৬২ অপরাজিত, আমির জাঙ্গু ৬৭; নমন ধির ১-৩৩, মোহাম্মদ সিরাজ ১-৫২)। ফলাফল: ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৫ উইকেটে জয়ী।