শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিরলস প্রচেষ্টার জন্য দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত মানবাধিকারকর্মী নাভি পিল্লাইকে ২০২৬ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি শুক্রবার অসলোতে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাঁর নাম ঘোষণা করে। পিল্লাইয়ের বিচারিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিগত সততা ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেছে নোবেল কমিটি। তাঁর নোবেল পুরস্কারের জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী প্রতীকী বিষয়…আমি আর ভাবতেই পারছি না। সাবেক বিচারকের শান্তিতে নোবেল জয়ের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আইসিসির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা।
পুরস্কার ঘোষণার সময় নাভি পিল্লাই জার্মানিতে ছিলেন। শুরুর দিকে এই সুসংবাদটি তাঁর কাছে কৌতুক বলে মনে হয়েছিল। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় হাস্যরসের মাধ্যমে তিনি বলেন, একজন আইনজীবী হিসেবে আমি বিষয়টি যাচাই করতে চাই। একই সঙ্গে তিনি কৌতুক করে মন্তব্য করেন, যদি সবাই আরেকটু বেশি করতালি দেয়, তবে তিনি হয়তো এই পুরস্কার ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। পরে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় পিল্লাই জানান, এই সম্মান তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার সব ভুক্তভোগী এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত সবার উদ্দেশে উৎসর্গ করছেন। তাই তাৎক্ষণিকভাবে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানো সবাইকে তিনি বলছিলেন, ‘এটি নিশ্চয়ই একটি কৌতুক!…আপনাদের এই করতালি আমার কাছে অনেক মূল্যবান।
নাভি পিল্লাইয়ের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে রয়েছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নানা উজ্জ্বল অধ্যায়। তিনি গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সভাপতি হিসেবে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া রুয়ান্ডার গণহত্যার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) প্রধান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচারক হিসেবে কাজ করছেন, যেখানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলমান রয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা জাতিসংঘ কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন নাভি পিল্লাই (৮৫)। তবে গাজা নিয়ে তদন্তের কাজটি জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনেরই।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস বলেন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচারের পথ সুগম করতে নাভি পিল্লাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা প্রবল চাপের মুখে রয়েছে। ক্ষমতার রাজনীতির কাছে আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি বৈশ্বিক শ্রদ্ধা কমে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পিল্লাইয়ের এই অর্জনে তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক। তিনি এটিকে মানবাধিকারের জন্য একটি সমষ্টিগত বিজয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড পিল্লাইয়ের সঙ্গে নুরেমবার্গে অবস্থানকালে এই ঘোষণায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পুরস্কার প্রদানের সমালোচনা করে দাবি করেছে যে, এর মাধ্যমে ইসরায়েলবিরোধী বিদ্বেষকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের এই অভিযোগ নাকচ করে নোবেল কমিটি জানিয়েছে, তারা কোনো পক্ষ নিচ্ছে না, বরং পিল্লাইয়ের পেশাদারিত্ব ও সততার ওপর আস্থা রেখেই এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্স পোস্টে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে।
নাভি পিল্লাই ১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে এক তামিল পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন বাসচালক। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াকু ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি লড়াই শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে ডারবানে নিজের আইন প্রতিষ্ঠান খোলেন, যা ছিল ওই অঞ্চলে কোনো অশ্বেতাঙ্গ নারীর প্রথম এমন উদ্যোগ। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৮ সালে আইন বিষয়ে ডক্টরেট অর্জন করেন।
১৯৯৫ সালে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ১৯৯৯ সালে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও সভাপতি হন। সেখানে ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা এবং ঘৃণা ছড়ানোর মতো বিষয়গুলোকে কীভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচার করা যায়, তা প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) বিচারক হিসেবে কাজ করার পর, ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।
আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সরব হয়ে পিল্লাই বলেন, আমরা এমন এক পৃথিবীর দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছি যেখানে বিচার বা কষ্ট বিবেচনা করার মানদণ্ড আইন নয়, বরং ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারিত হয়। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় অবিচল থেকেছেন। তিনি জানান, বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষা ও এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা অবিচল থেকেছেন।

