যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হ্যামট্রামিক সিটির মেয়র নির্বাচনে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর নতুন মাইলফলক স্পর্শ করার অপেক্ষায় আছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী মুহিত মাহমুদ। আদালতের নির্দেশে গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার ওয়েইন কাউন্টি বোর্ড অব ক্যানভাসার্স বিতর্কিত ৩৭টি ব্যালট পুনরায় গণনা সম্পন্ন করেছে। এই নতুন গণনার ফলে ভোটের ব্যবধানে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে, যা মুহিত মাহমুদকে এখন বর্তমান মেয়র অ্যাডাম আলহারবির চেয়ে ১২ ভোটে এগিয়ে দিয়েছে। বাকি দুটি ব্যালট অন্যভাবে হিসাবভুক্ত হয়। একসময় শিল্পকারখানানির্ভর অভিবাসী শহর হিসেবে পরিচিত হ্যামট্রামিক আজ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বসতি। হ্যামট্রামিক এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পায়। ২০২১ সালের নির্বাচনে ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত আমের গালিব শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে তিনি হ্যামট্রামিক সিটি কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শুরুতে অ্যাডাম আলহারবি মাত্র ১১ ভোটের ব্যবধানে মুহিত মাহমুদকে পরাজিত করেছিলেন। নির্বাচনের ঠিক পরদিন নগরীর ক্লার্কের কার্যালয়ে ৩৭টি ব্যালট পাওয়া যায়, যা মূল গণনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। মুহিত মাহমুদ এই ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চলতি বছরের মার্চ মাসে মিশিগান কোর্ট অব আপিল নিম্ন আদালতের পূর্বের রায় বাতিল করে বিষয়টি নতুন করে পর্যালোচনার নির্দেশ দেয়। এরপর ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টের বিচারক ক্যাথলিন ম্যাকার্থি বিতর্কিত ৩৭টি ব্যালট পুনর্গণনার নির্দেশ দেন। ভোট পুনর্গণনার পরও ওই ব্যবধান বহাল থাকায় আলহারবিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। এ কারণে ওয়েইন কাউন্টির নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথমে ব্যালটগুলো গণনায় অন্তর্ভুক্ত করেননি। মার্কিন গণমাধ্যম ডব্লিউডিইটি ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগেই মুহিত মাহমুদের প্রার্থিতাকে এই ঐতিহাসিক সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছিল।
ডব্লিউডিআইভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে গণনা করা ব্যালটগুলোর মধ্যে মুহিত মাহমুদ ২৯টি ভোট পেয়েছেন এবং অ্যাডাম আলহারবি পেয়েছেন ৬টি ভোট। এই পরিবর্তনের ফলে মোট ফলাফলে মুহিত মাহমুদ ২ হাজার ৮৯ ভোট নিয়ে বর্তমান মেয়র অ্যাডাম আলহারবির ২ হাজার ৭৭ ভোটের চেয়ে ১২ ভোটে এগিয়ে গেছেন। মুহিত মাহমুদ নিজেকে হ্যামট্রামিকের বৈধ বাসিন্দা হিসেবে দাবি করে আসছেন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সব আইনি শর্ত পূরণ করেছেন বলে জানিয়েছেন। ব্যালটগুলোর সংরক্ষণ ও হস্তান্তরসংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ডব্লিউডিআইভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে গণনা করা ব্যালটগুলোর মধ্যে মুহিত পান ২৯ ভোট এবং আলহারবি পান ৬ ভোট। তাঁর আইনজীবী নাবিহ আয়াদ জানিয়েছেন, বিতর্কিত ব্যালটগুলোর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়ে আইনি আপত্তি অব্যাহত থাকবে।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভোটাধিকার রক্ষা এবং সঠিক গণনা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন স্থানীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে। মুহিত মাহমুদের এই এগিয়ে থাকা কেবল সংখ্যাগত নয়, বরং এটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের এক বড় দৃষ্টান্ত। আগামী ২২ অক্টোবর ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টে মুহিত মাহমুদের আবাসিক যোগ্যতা সংক্রান্ত মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ওপরই নির্ভর করছে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল। যতক্ষণ না পর্যন্ত আদালত পরবর্তী কোনো নির্দেশনা দিচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সংশোধিত ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করা সম্ভব হবে না। আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যদি মুহিত মাহমুদের পক্ষে আসে, তবে তিনি হবেন হ্যামট্রামিকের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র। এটি স্থানীয় রাজনীতিতে যেমন নতুন অধ্যায় সূচনা করবে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অগ্রযাত্রায় এটি একটি স্মরণীয় মাইলফলক হয়ে থাকবে। এ অর্জন কেবল একজন প্রবাসী বাংলাদেশির ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসেও যুক্ত করবে নতুন অধ্যায়। ডেট্রয়েট নগরীর ভেতরে অবস্থিত ছোট এই শহরে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশি অভিবাসীরা ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন। অভিবাসীদের প্রথম প্রজন্ম যেখানে জীবিকা ও পরিবার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বেশি মনোযোগী ছিল, সেখানে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা নগর প্রশাসন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্বেও এগিয়ে এসেছেন। একই সময়ে নগর পরিষদেও মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০০ সালে মিশিগানে আসার পর তিনি পড়াশোনা, কর্মজীবন ও কমিউনিটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। নগর প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২৫ সালে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বাংলাদেশে ইসলামি ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা করা মুহিত যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি এমজিএম গ্র্যান্ড ক্যাসিনোতে কাজ করেছেন এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারে স্থানীয় সড়ক ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, সম্পত্তিকর, পানির বিল এবং নাগরিক সেবার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল। প্রয়োজনে পুনর্গণনাসহ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও তাঁদের বিবেচনায় রয়েছে।

