রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে তিন দশকেরও বেশি সময় আগে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে রাজউকের এই প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ১৫০ একর জমিতে ৩০টি সেক্টরে প্রায় ২৬ হাজার আবাসিক প্লট ও লক্ষাধিক অ্যাপার্টমেন্টের পরিকল্পনা করা হয়। এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময় ২০১৩ সাল পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটি আজও তার পূর্ণতা পায়নি।
প্রকল্প এলাকায় ভূমি উন্নয়ন ও কিছু সড়ক নির্মাণের কাজ এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু নাগরিক সুবিধার অভাব এখনো প্রকট। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, গ্যাস সংযোগ, নিয়মিত বাজার ও পর্যাপ্ত যানবাহনের অভাবে এলাকাটি জনশূন্য প্রায়। রাতের অন্ধকারে সড়কবাতির অভাবে পুরো এলাকা নির্জন হয়ে পড়ে। ফলে ২১ হাজারের বেশি প্লট হস্তান্তর করা হলেও মাত্র তিন শতাধিক প্লটে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
প্লট মালিকদের অভিযোগ, রাজউক যেসব সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার কোনোটিই বাস্তবে নেই। জহিরুল ইসলাম ২০০৯ সালে প্লট বরাদ্দ পাওয়ার পর বছরের পর বছর অপেক্ষায় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কোনো সুবিধা ছাড়াই তিনি বাড়ি নির্মাণ শুরু করতে বাধ্য হন। শাহজাহান মিয়ার মতো আরও অনেক মালিক গ্যাস, বাজার ও নিরাপত্তার অভাবে বাড়ি বানানোর সাহস পাচ্ছেন না। সীমানা প্রাচীর না থাকায় অনেক প্লটে স্থানীয়রা চাষাবাদ করছেন। এছাড়া তিন জেলার সীমানা বিরোধ ও রাজউকের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফাইল আটকে থাকায় মালিকরা প্রতিদিন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
সম্প্রতি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে পূর্বাচলকে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের অংশ থেকে ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, ডিএমপি ও ঢাকা ওয়াসার আওতায় আনা হয়েছে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে রাজউকের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে এবং দ্রুতই প্রশাসনিক ভবন ও জোনাল অফিস স্থাপন করা হবে।
রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম জানান, পূর্বাচলকে দ্রুত বাসযোগ্য করতে নতুন করে ৮ হাজার ৮৭০ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এতে সড়ক সম্প্রসারণ, ড্রেনেজ, মার্কেট, খেলার মাঠসহ বিভিন্ন সুবিধা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া চারটি থানা, ছয়টি তদন্ত কেন্দ্র ও হাজার হাজার পদ সৃষ্টির মাধ্যমে নিরাপত্তার পরিকল্পনাও চলছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, পূর্বাচলকে ঢাকার সঙ্গে যুক্ত করার ফলে ঢাকামুখিতা আরও বাড়বে। তার মতে, মাঠপর্যায়ে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ও সেবা সমন্বয় না হলে শুধু কাগজে সীমানা বদলালে মূল উদ্দেশ্য সফল হবে না। ঢাকার আবাসন সংকট সমাধানের আদর্শ প্রকল্প হিসেবে শুরু হওয়া এই এলাকাটি আজ নিজেই সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া আধুনিক নগরীর স্বপ্ন আরও কয়েক বছর বন্দি থাকার আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
২০১৪ সালে বরাদ্দ পেয়েও তিনি এখনো জায়গা ফাঁকা রেখেছেন।

