ভিন্নমতকে সম্মান করাই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি: মির্জা ফখরুল

টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কেবল নির্বাচন আয়োজন বা সরকার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক চর্চা, সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই। শুক্রবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত ‘টেকসই গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্র কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি একটি সংস্কৃতি। নিয়মভিত্তিক এই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মতামতের প্রতিফলন থাকতে হয়। মানুষের চিন্তা, আচরণ ও রাজনৈতিক চর্চার প্রতিটি স্তরে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন ছাড়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গণতান্ত্রিক চর্চার সূচনা করেছিলেন এবং পরে খালেদা জিয়াও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, তবে বিভিন্ন সময়ে তা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই সরকারকে ব্যর্থ ঘোষণা করা বা পদত্যাগের দাবি তোলা গণতান্ত্রিক আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের সমাধান সংসদ ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। রাস্তায় নেমে চাপ সৃষ্টি বা ‘মব’ তৈরির সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা। নিজের মতের সঙ্গে মিল না থাকলেও অন্যের মত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, কারণ রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা টেকসই গণতন্ত্রের পথে বড় অন্তরায়।

আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দলটি গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। গত ১৫ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের নিরপেক্ষভাবে সত্য তুলে ধরতে হবে। তবে সংবাদমাধ্যমের মালিকানা কাঠামো ও আর্থিক বাস্তবতা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পথে বড় বাধা। অনেক মালিক ব্যবসায়িক বা আর্থিক কারণে সরকারের ওপর নির্ভরশীল থাকায় সমালোচনামূলক সংবাদ প্রকাশে সংকোচ তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি চাপ না থাকলেও অনেক সংবাদকর্মী আত্মনিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটেন। এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে সত্য প্রকাশে সাহসী হওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সাংবাদিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মির্জা ফখরুল বলেন, অনেক সাংবাদিককে নোটিশ ছাড়াই চাকরিচ্যুত করা হয় এবং বেতন ও চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মালিক ও সাংবাদিকদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিষয়ে তিনি বলেন, ছোট একটি ভিডিও বা বিভ্রান্তিকর তথ্য মুহূর্তের মধ্যে মানুষের দীর্ঘদিনের অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।

বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি কঠিন রূপান্তরকালীন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব পালন করছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং খাতের সমস্যার সমাধানে সময় প্রয়োজন। তিনি সরকার, গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল এবং সমাজের সব অংশকে ধৈর্যশীল ও সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান।

শুক্রবার (৭ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিল আয়োজিত ‘টেকসই গণতন্ত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত