এভারেস্টের শতবর্ষী রহস্য: স্যান্ডি আরভাইনের দেহাবশেষের সন্ধানে বদলে যেতে পারে ইতিহাসের মোড়

বিশ্বের পর্বতারোহণের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি হলো ১৯২৪ সালের ব্রিটিশ এভারেস্ট অভিযান। সেই অভিযানে জর্জ ম্যালরির সঙ্গে চূড়ায় ওঠার চেষ্টাকালে নিখোঁজ হওয়া অ্যান্ড্রু কমিন ‘স্যান্ডি’ আরভাইনের দেহাবশেষের নতুন সূত্র পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের একটি অনুসন্ধানী দল এভারেস্টের উত্তর দিকের সেন্ট্রাল রংবুক হিমবাহ এলাকায় পুরোনো একটি জুতা ও পায়ের কিছু অংশ খুঁজে পায়। এই আবিষ্কারটি শত বছর ধরে চলে আসা রহস্যের জট খোলার নতুন পথ তৈরি করেছে।

অভিযাত্রী দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিখ্যাত পর্বতারোহী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জিমি চিন। জুতাটির ভেতরে থাকা মোজায় ‘এ.সি. আরভাইন’ নাম লেখা ছিল, যা এই দেহাবশেষটি যে আরভাইনেরই, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বর্তমানে এই দেহাবশেষটি তিব্বতের পর্বতারোহণ কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখক জুলি সামার্স এবং পর্বতারোহণ ইতিহাসবিদ ইয়োখেন হেমলেব ‘দ্য এভারেস্ট মিস্ট্রি: স্যান্ডি আরভাইন, জর্জ ম্যালরি অ্যান্ড দ্য ট্রুথ’ নামে একটি নতুন বই প্রকাশ করছেন, যা ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে উন্মোচিত হবে।

স্যান্ডি আরভাইন ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২ বছর বয়সী এক তরুণ। ১৯২৪ সালের ৮ জুন ম্যালরির সঙ্গে চূড়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় অভিযানের সদস্য নোয়েল ওডেল তাদের শেষবারের মতো দেখেছিলেন। এরপর কুয়াশাচ্ছন্ন এভারেস্টে তাদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। ১৯৯৯ সালে ম্যালরির দেহ ২৭ হাজার ফুট উচ্চতায় পাওয়া গেলেও আরভাইনের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। তবে ১৯৩৩ সালের একটি ব্রিটিশ অভিযানে তার ব্যবহৃত একটি বরফকুঠার খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল, যা তার অবস্থান সম্পর্কে গবেষকদের ধারণা দিয়েছিল।

আরভাইনের দেহাবশেষ খুঁজে পাওয়ার গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ তার কাছে একটি ছোট কোডাক ভেস্ট পকেট ক্যামেরা থাকার কথা ছিল। যদি সেই ক্যামেরাটি উদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং তাতে কোনো ফিল্ম বা ছবি পাওয়া যায়, তবেই জানা যাবে ১৯৫৩ সালে এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগের প্রায় তিন দশক আগেই ম্যালরি ও আরভাইন বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে পৌঁছেছিলেন কি না। যদি তারা সত্যিই চূড়ায় পৌঁছে থাকেন, তবে পর্বতারোহণের পুরো ইতিহাসই নতুন করে লিখতে হবে।

১৯৬০ ও ১৯৭৫ সালের চীনা অভিযানে পুরোনো পোশাক পরিহিত এক ইউরোপীয় পর্বতারোহীর দেহ দেখার দাবি উঠেছিল, যা আরভাইনের দেহাবশেষের অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বর্তমান গবেষকদের ধারণা, আরভাইনের দেহাবশেষ যেখানে পাওয়া গেছে, সেটি ম্যালরির দেহ পাওয়ার স্থান থেকে অনেক নিচে। সম্ভবত দুর্ঘটনার সময় তাদের দড়ি ছিঁড়ে যাওয়ায় আরভাইন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে পড়ে হিমবাহে আটকা পড়েছিলেন।

যদিও এখন পর্যন্ত সেই কাঙ্ক্ষিত ক্যামেরাটি পাওয়া যায়নি, তবুও নতুন এই আবিষ্কার অনুসন্ধানের পরিধি অনেক কমিয়ে এনেছে। গবেষকদের বিশ্বাস, ক্যামেরাটি এখনো সেই হিমবাহের আশেপাশেই কোথাও থাকতে পারে। আরভাইনের নাতনি জুলি সামার্সের মতে, এই আবিষ্কার কেবল মৃত্যুর রহস্য সমাধান নয়, বরং ১৯২৪ সালের সীমিত প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ম্যালরি ও আরভাইন যে উচ্চতায় পৌঁছেছিলেন, তা এক অসাধারণ কীর্তি হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জুতার ভেতরের মোজায় লাল অক্ষরে ‘A.C। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বইটিতে আরভাইনের জীবন, ১৯২৪ সালের সেই অভিযানের শেষ মুহূর্ত এবং ম্যালরি-আরভাইন আদৌ এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন কি না এসব প্রশ্ন নতুন করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অভিজ্ঞ পর্বতারোহী হিসেবে ম্যালরির তুলনায় তিনি অনেকটাই নবীন ছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু শারীরিক সক্ষমতা ও যন্ত্রপাতি নিয়ে দক্ষতার কারণে ম্যালরি তাকে শেষ অভিযানের সঙ্গী হিসেবে বেছে নেন বলে গবেষকেরা মনে করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আরভাইন অক্সফোর্ডের নৌকাবাইচ দলেরও দক্ষ খেলোয়াড় ছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে ১৯২৪ সালের অভিযানে ব্যবহৃত অক্সিজেন সরঞ্জামকে হালকা ও কার্যকর করার কাজেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কুয়াশা নেমে আসার আগে তারা পাহাড়ের ওপরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখন থেকেই প্রশ্ন ছিল ঠিক কী ঘটেছিল তাদের সঙ্গে।