রংপুর শিক্ষক পরিবার ট্র্যাজেডি: তদন্তে নতুন মোড় ও রহস্য উন্মোচনের দাবি

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার বাসিন্দা ও জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে হারিয়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর পুলিশ দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে এবং আদালতে তাদের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও নেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনার নেপথ্যের কারণ ও পুলিশের ভাষ্য নিয়ে জনমনে নানা ধোঁয়াশা ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

পুলিশের প্রাথমিক দাবি অনুযায়ী, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু একই বাড়িতে চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যার ঘটনা, ঘটনাস্থলের আলামত, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকা, বাড়ির ফটক বাইরে থেকে তালাবদ্ধ পাওয়া এবং দ্রুততম সময়ে আসামি শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং দ্রুত চার্জশিট প্রদানের লক্ষ্যে মামলার তদন্তভার কোতয়ালী থানা থেকে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়েছে। গত সোমবার বিকেলে কোতয়ালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চট্টোপাধ্যায় মামলার যাবতীয় নথিপত্র নতুন তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক জিনাত আলীর কাছে হস্তান্তর করেন। এরপরই দুই তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্রিফিং সম্পন্ন করেন।

গ্রেপ্তারকৃত দুই যুবকের নাম মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, অধিকতর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের স্বার্থেই মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।

এদিকে, পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্যের অমিল নিয়ে জনমনে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চিকিৎসক বাবলু কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তবে গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ের চোয়াল ভেঙে যাওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া মরদেহ পচনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় মুখমণ্ডল কিছুটা বিকৃত হয়েছে, যা কোনো রাসায়নিক বা অ্যাসিডের কারণে নয় বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। ময়নাতদন্তের সময় সংগৃহীত নমুনাগুলো সিআইডির ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ফরেনসিক চিকিৎসকের একই ধর্মাবলম্বী হওয়া এবং আসামির পোশাকের মিল নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। যদিও পুলিশ কর্মকর্তারা এসব অভিযোগের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সিদ্ধার্থ দাসের বাবা বিনয় দাস দাবি করেছেন, তার ছেলে স্বর্ণশ্রমিক এবং সে মাদকের সঙ্গে জড়িত কি না তা তাদের জানা নেই। তবে চারজনকে হত্যার বিষয়টি তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।

ঘটনার সঠিক তদন্ত ও রহস্য উন্মোচনের দাবিতে রংপুরে বিভিন্ন সংগঠন ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবার দুপুরে জিলা স্কুলের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা প্রধান ফটকের সামনে সড়ক অবরোধ করে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানান। তারা পুলিশের দেওয়া প্রাথমিক বক্তব্যকে ‘সাজানো নাটক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একই দাবিতে বাংলার চোখ, নাগরিক আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির মতো সংগঠনগুলোও কর্মসূচি পালন করেছে।

নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, তার ভাই অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি পুলিশের ওপর আস্থা রেখে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছেন। গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে প্রতিবেশীদের বাড়ি নির্মাণ সংক্রান্ত বিরোধের কথা শোনা গেলেও তা আগেই সমাধান হয়েছিল বলে তিনি জানান।

উল্লেখ্য, গত ২২ আগস্ট রাতে বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের ধারণা, গত ২০ আগস্ট মধ্যরাতে তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে সব ধরনের আলামত সংগ্রহ করেছে, যা এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পুলিশ বলছে, অধিকতর স্বচ্ছ তদন্ত ও দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার জন্যই তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গতকাল সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকেলে মামলার তদন্তভার কোতয়ালী থানা থেকে গোয়েন্দা বিভাগে (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাদের চোয়াল ভাঙার কোনো প্রমাণও ময়নাতদন্তে মেলেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: লাশের মুখ তরল পদার্থ বা অ্যাসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়া হয়েছে- এমন গুঞ্জনেরও কোনো সত্যতা ময়নাতদন্তে মেলেনি বলে দাবি করেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আলোচনায় আসা ওই শার্টের রং তিনি চেনেন না বলে জানিয়েছে ন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রাতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) মশাল মিছিল করে।