একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো নিরাপদ ও সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন প্রাপ্যতা। চিকিৎসক বা হাসপাতালের আধুনিক অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও যদি রোগীর প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য না হয়, তবে সেই চিকিৎসা ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ নিশ্চিত করা কেবল শিল্পনীতির বিষয় নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সম্প্রতি বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বাপি) এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৪ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকা ওষুধগুলোর একটি বিশাল অংশ বর্তমানে উৎপাদন করা হচ্ছে না। বাপির দাবি, তালিকাভুক্ত ওষুধের প্রায় ৬০ শতাংশই বিভিন্ন কোম্পানি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণ হিসেবে তারা উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাঁচামালের উচ্চমূল্য, ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এবং শ্রমিকের মজুরি বাড়ার কথা উল্লেখ করেছে। যদিও এই বক্তব্য শিল্পমালিকদের পক্ষ থেকে এসেছে, তবুও সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে স্বাধীনভাবে এর সত্যতা যাচাই করতে হবে। তবে যদি এই তথ্যের সামান্য অংশও সত্য হয়, তবে তা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের গুরুত্ব ও সংকট
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বলতে এমন সব জীবন রক্ষাকারী উপাদানকে বোঝায় যা অধিকাংশ মানুষের সাধারণ ও জটিল রোগের চিকিৎসায় অপরিহার্য। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, হাঁপানি, ডায়রিয়া এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় এসব ওষুধের বিকল্প নেই। উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রোগীরা বাধ্য হয়ে বেশি দামের বিকল্প ওষুধ কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার আর্থিক সংকটে ওষুধ কেনা বন্ধ করে দিচ্ছে, যার ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করছে এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশ জনগণকে নিজস্ব পকেট থেকে বহন করতে হয়। ফলে পরিবারের একজন সদস্য দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থ হলে পুরো পরিবার ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে বা সম্পদ বিক্রির মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। তাই ওষুধের প্রাপ্যতা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণ কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।
উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কারণসমূহ
বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প দেশের চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করলেও কাঁচামালের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ওষুধ উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল; বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে মাঝপথে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে পুরো ব্যাচ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিল্পমালিকদের অভিযোগ, গত তিন দশকে উৎপাদন ব্যয় অনেক বাড়লেও অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য বাস্তবতার নিরিখে সমন্বয় করা হয়নি। তবে ওষুধের দাম বাড়ানোই একমাত্র সমাধান নয়। উৎপাদক যদি ব্যয় তুলতে না পারেন তবে তিনি উৎপাদন বন্ধ করবেন, আবার অবাধে দাম বাড়ালে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। তাই এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন যেখানে রোগীর স্বার্থ, উৎপাদনকারীর টেকসই ব্যবসা এবং সরকারের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় থাকবে।
সরকারের করণীয় ও প্রস্তাবিত পদক্ষেপ
এই সংকট নিরসনে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ঘাটতি বাড়লে বাজারে নকল ও নিম্নমানের ওষুধের বিস্তার ঘটতে পারে এবং দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমে যেতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচিত অবিলম্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় কমিটি গঠন করা। এই কমিটিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি, চিকিৎসক, ফার্মাকোলজিস্ট, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ এবং ভোক্তা প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কমিটির প্রধান কাজগুলো হবে নিম্নরূপ
- উৎপাদন বন্ধ থাকা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও কারণ চিহ্নিত করা।
- উৎপাদন পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা প্রদান।
- মূল্য সমন্বয় বা সরকারি ভর্তুকি প্রদানের যৌক্তিকতা যাচাই করা।
- অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণে একটি স্বয়ংক্রিয় ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি চালু করা, যা মূল্যস্ফীতি ও কাঁচামালের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
- রাষ্ট্রায়ত্ত এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানির উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যাতে সরকারি হাসপাতালে সরবরাহ নিশ্চিত থাকে।
- ওষুধ শিল্পকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
- দেশে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বৈদেশিক নির্ভরতা কমানো।
পরিশেষে, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আমাদের জাতীয় গৌরব। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। সরকার, শিল্প মালিক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অধ্যাপক ও কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমার অভিমত, জনস্বাস্থ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কালক্ষেপণ করার সুযোগ নেই। এখনই বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে ওষুধের সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সুরক্ষিত থাকে। চাকরির আরও তথ্য: লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি ), বিভাগীয় প্রধান-কার্ডিওলজি, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। চাকরির আরও তথ্য: কিন্তু যদি বাস্তব চিত্র এর কাছাকাছিও হয়, তাহলে এটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। চাকরির আরও তথ্য: আজ যদি বাস্তবভিত্তিক, বিজ্ঞানসম্মত এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু ওষুধ উৎপাদনেই নয়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বিশ্বের জন্য একটি অনুসরণীয় উদাহরণ হতে পারবে।

