গোয়েন্দা সতর্কতা উপেক্ষা করে নেতানিয়াহুর পরামর্শে ইরানে সামরিক অভিযান ট্রাম্পের

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতির বিষয়ে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেই সব সতর্কবার্তাকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরামর্শেই শেষ পর্যন্ত ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলার কয়েক দিন আগে ট্রাম্প ওভাল অফিসে তাঁর গোয়েন্দাপ্রধানকে তলব করেছিলেন। সেই সময় ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ এক সহকারী এবং নেতানিয়াহু তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হন যে, ইরান কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। তাঁদের মতে, এটিই ছিল দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করার মোক্ষম সময়।

তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তৎকালীন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড ট্রাম্পকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে তেহরান দ্রুত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা ছিল। পাশাপাশি সামরিক কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছিলেন যে, এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত মার্কিন বাহিনীর জন্য বড় ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।

সব ধরনের সতর্কতা উপেক্ষা করে ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ইরানে হামলার নির্দেশ দেন এবং একই সঙ্গে দেশটির জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানান। ট্রাম্পের ধারণা ছিল, যুদ্ধটি ছয় মাসের মধ্যেই শেষ হবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এখনো দেশটির নিরাপত্তা ও সামরিক কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা অব্যাহত রয়েছে।

এই যুদ্ধের ফলে এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার ইরানি এবং ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। পেন্টাগনের তথ্যমতে, এই সংঘাতে আরও ৭৫৬ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস ছিল তুঙ্গে। ২৮ ফেব্রুয়ারি অভিযান শুরুর পর সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ এবং ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ মার-এ-লাগোতে এক তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে তাঁকে জানান যে, ইসরায়েল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করেছে। খবরটি শুনে ট্রাম্প এতটাই উচ্ছ্বসিত হন যে, তিনি উপস্থিত অতিথিদের সামনে তা ঘোষণা করতে বলেন, যা উপস্থিতরা করতালি ও উল্লাসের মাধ্যমে গ্রহণ করেন।

তবে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্প পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। পরে ১৭ জুন একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার পথ তৈরি হয় এবং ৬০ দিনের পারমাণবিক আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই সমঝোতাও স্থায়ী হয়নি; চুক্তির পরপরই তেহরান আবার বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করলে ট্রাম্প একে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করেন।

পারমাণবিক আলোচনার ৬০ দিনের সময়সীমা ১৭ আগস্ট শেষ হয়েছে। এর তিন দিন পর অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। হোয়াইট হাউস অবশ্য গোয়েন্দা মূল্যায়ন উপেক্ষার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, পেন্টাগন থেকে প্রাপ্ত নিরপেক্ষ তথ্যের ভিত্তিতেই প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে ইরানকে চাপে রাখার পাশাপাশি এই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজছে প্রশাসন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা কার্যকর হবে, সেটিই জানতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁর মতে, এর ফলে ইরানে আরও কট্টরপন্থী একটি সরকার ক্ষমতায় আসতে পারে, যারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ব্যাপারে আরও আগ্রহী হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এবং মিত্রদের কাছে ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলে গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের আশঙ্কা ছিল, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি বাড়বে, অস্ত্রের মজুত কমে যাবে এবং আগে থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাস্তবে সেই সময়সীমা অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ছয় মাস পরও যুদ্ধের কোনো স্থায়ী সমাধান দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্বাধীন তেহরানের সরকারও আত্মসমর্পণের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি।