‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী ঘিরে বিতর্ক: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্মাতাসহ বিভিন্ন মহলের ক্ষোভ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রদর্শনী ঘিরে বিতর্ক: নির্মাতাসহ বিভিন্ন মহলের ক্ষোভ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রটির পূর্বনির্ধারিত প্রদর্শনী বন্ধের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষের প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সিনেমাটির নির্মাতা ও প্রযোজক তানিম নূর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে, চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুরো ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে।

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি এই চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। তবে জেলার কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সিনেমাটি প্রদর্শন না করার পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট দিচ্ছেন। এই বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতক শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত একটি সামাজিক সংগঠন। তারা গত এক বছর ধরে ‘ভাতঘুমের সিনেমা আড্ডা’ শিরোনামে নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শন করে আসছে।

নির্মাতা তানিম নূরের ক্ষোভ ও আহ্বান

‘বনলতা এক্সপ্রেস’ সিনেমার নির্মাতা ও প্রযোজক তানিম নূর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন এই বিষয়ে। ২৯ মে বেলা তিনটার দিকে তিনি জানান, “চার-পাঁচ দিন আগেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে সিনেমাটি প্রদর্শনের আগ্রহ প্রকাশ করে। আমি এতে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলাম। তারা পোস্টার তৈরি করে আমাকে পাঠিয়েছিল এবং আমি তাদের বলেছিলাম যেকোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে জানাতে।”

তবে ২৮ মে ফেসবুকে তিনি দেখতে পান যে, একটি পক্ষ পোস্ট দিয়ে প্রচার করছে যে সেখানে সিনেমা নিষিদ্ধ এবং এটি চালানো যাবে না। তানিম নূর জোর দিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, সেন্সর বোর্ড থেকে সনদপ্রাপ্ত যেকোনো ছবি দেশের যেকোনো স্থানে প্রদর্শিত হতে পারে। শুধু তাই নয়, এমন সিনেমার প্রদর্শনীতে প্রশাসনও সহায়তা করতে বাধ্য।”

তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে নির্মাতা আরও বলেন, “তারা আমার ছবির পোস্টারে ক্রস চিহ্ন দিয়ে প্রচার চালাচ্ছে এবং উগ্রবাদী কথাবার্তা বলছে। এটা তাদের করার কোনো অধিকার নেই। এটি একটি ভয়ংকর এবং সম্পূর্ণ বেআইনি কাজ। চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের সনদপ্রাপ্ত কোনো ছবি নিষিদ্ধের কথা বললে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”

তানিম নূরের গ্রামের বাড়িও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, এবং তার মা-বাবা সেখানেই বসবাস করেন। এই কারণে ২৮ মে থেকে তার মন আরও বেশি খারাপ বলে তিনি জানান। তিনি ৩০ মে যেন সিনেমাটির প্রদর্শনী সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, সেজন্য প্রশাসনের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, যারা সিনেমাটি প্রদর্শনী না করতে প্রচার চালাচ্ছে, তাদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নির্মাতার ভাষ্যে, “বাংলাদেশে তো সিনেমার প্রদর্শনী নিষিদ্ধ নয়। কেবল আমার সিনেমা বলে বলছি না, এসব ঘটনা সত্যিই উদ্বেগজনক। আমি আশা করব, যারা এ রকম বলছে, তাদের শুভ বুদ্ধি উদয় হবে। তারাও তো বাংলাদেশে বসবাস করে, তাই না? বাংলাদেশে আইন মেনেই আমাদের সবাইকে বসবাস করতে হবে।”

চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপের উদ্বেগ ও সতর্কতা

২৯ মে দুপুরে চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ পুরো ঘটনায় তাদের উদ্বেগ জানিয়ে গণমাধ্যমে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। ‘“বনলতা এক্সপ্রেস” প্রদর্শনী নিষিদ্ধের দাবির তীব্র নিন্দা এবং উগ্র গোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত সাংস্কৃতিক সেন্সরশিপের বিপজ্জনক নজির প্রসঙ্গে চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপের সতর্কতা’ শিরোনামের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে:

  • সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি চলচ্চিত্র সংসদের পূর্বনির্ধারিত প্রদর্শনীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উসকানিমূলক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
  • একটি আইনসম্মত ও সনদপ্রাপ্ত শিল্পকর্মের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে সুকৌশলে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক আবেগকে ব্যবহার করা হয়েছে।
  • এটি কোনোভাবেই চলচ্চিত্রের সমালোচনা নয়; বরং এটি ভীতি প্রদর্শন, ধর্মীয় অপব্যাখ্যা এবং কৃত্রিম ক্ষোভ সৃষ্টির মাধ্যমে রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের জনজীবনে একটি সমান্তরাল ও উগ্র গোষ্ঠী-নিয়ন্ত্রিত সাংস্কৃতিক আচরণবিধি চাপিয়ে দেওয়ার এক নগ্ন অপচেষ্টা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ দীর্ঘকাল ধরে এই মত পোষণ করে আসছে যে একটি সুস্থ জাতীয় চলচ্চিত্র ব্যবস্থা এবং একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ একে অপরের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের প্রক্রিয়া পার হওয়া একটি চলচ্চিত্র এমন একটি আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই ও অনুমোদিত হয়, যা মূলত জনসাধারণের জন্য কী প্রদর্শনযোগ্য তা নির্ধারণ করার জন্যই প্রতিষ্ঠিত।

কোনো গোষ্ঠী যখন আইনি বা সংসদীয় বিতর্কের পথে না হেঁটে সামাজিক চাপ, ধর্মীয় বয়ান এবং বিশৃঙ্খলার হুমকির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে, তখন তারা কেবল একটি চলচ্চিত্রের ওপরই আক্রমণ করে না; বরং তারা সাংস্কৃতিক জীবন পরিচালনায় রাষ্ট্রের আইনি কর্তৃপক্ষের বৈধতাকেই সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ তার এই অবস্থানে অনড়—যেকোনো চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা, তাত্ত্বিক বিতর্ক বা তীব্র জন-অসন্তোষ কেবল গ্রহণযোগ্যই নয়, বরং তা একটি সচেতন নাগরিক সমাজের স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর প্রতিক্রিয়া। কিন্তু দমনের দাবি, নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা এবং উগ্র গোষ্ঠী কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া নীরবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, চলচ্চিত্র সংস্কার রোডম্যাপ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে—তারা যেন তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্ব নিশ্চিত করে এবং আইনবহির্ভূত কোনো চাপে কোনো সনদপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তা সক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করে। এ ধরনের অপতৎপরতার মুখে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা কোনো নিরপেক্ষতা নয়, বরং তা এক প্রকারের নীরব সম্মতি বা যোগসাজশ।