ফ্রান্সে দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সংগ্রাম এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার স্বপ্নের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আশরাফ ইসলাম ও হাবিবা জেসমিনের পরিবার। তাদের ছেলে দানিয়েল আশরাফ উচ্চশিক্ষা শেষ করে প্যারিসের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ফেলো হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছেন। অন্যদিকে মেয়ে দিয়ান আশরাফ ফরাসি সরকারের সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে দেশটির উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন। এই দুই তরুণের সাফল্য শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং ফ্রান্সে বসবাসরত অভিবাসী বাংলাদেশিদের গৌরবের এক নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পরিবারের সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম খবর এসেছে ছেলে দানিয়েল আশরাফকে ঘিরে। প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা কার্যক্রমে Inserm, CNRS, Sorbonne Université এবং AP-HP-সহ বিভিন্ন একাডেমিক ও চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত অংশগ্রহণ রয়েছে।
পরিবারের সূত্র অনুযায়ী, রাজবাড়ীর সন্তান আশরাফ ইসলাম প্রায় ১৯৮০-এর দশকে ফ্রান্সে পাড়ি জমান। নতুন দেশ, ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবার গড়ে তোলার দীর্ঘ এই পথচলায় তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী হাবিবা জেসমিন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর তিনি ২০০৭ সাল থেকে ফ্রান্সের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থায় কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি প্যারিসের ১৩তম অ্যারোঁদিসমঁ-এর হপিতাল পিতিয়ে-সালপেত্রিয়েরের স্ত্রীরোগ বিভাগে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। একই হাসপাতালের অভ্যন্তরে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব দ্য ব্রেন বা ইনস্টিটিউ দ্য সার্ভো-তে গবেষণা ফেলো হিসেবে যোগ দিয়েছেন তাদের ছেলে দানিয়েল আশরাফ। গত ১ অক্টোবর তিনি ফ্রান্সের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এআই, কম্পিউটার সায়েন্স ও গণিত বিষয়ে ডাবল মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। এই দীর্ঘ যাত্রায় তার সহধর্মিণী হাবিবা জেসমিনও নিজস্ব পেশাগত জীবন গড়ে তোলার পাশাপাশি সন্তানদের শিক্ষার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। হাসপাতালটি ফ্রান্সের সরকারি হাসপাতালব্যবস্থা AP-HP-এর অন্তর্ভুক্ত এবং একই সঙ্গে শিক্ষা ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে দানিয়েলের নতুন কর্মস্থল এবং তার মায়ের কর্মস্থল একই বৃহৎ হাসপাতাল কমপ্লেক্সের ভেতরে হওয়ায় বিষয়টি পরিবারটির জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীরা যখন নতুন দেশে নিজেদের জীবন প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন, তখন তাদের সন্তানদের সামনে তৈরি হয়েছে ফ্রান্সের শিক্ষা ও পেশাগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।
পরিবারটির এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অধ্যবসায় ও নানা প্রতিবন্ধকতা। হাবিবা জেসমিন জানান, তার ছেলে দানিয়েলের শিক্ষাজীবনের পথটি মোটেও সহজ ছিল না; বরং সেখানে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। তবে সব বাধা পেরিয়ে ছেলে আজ গবেষণা ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছেন। অন্যদিকে মেয়ে দিয়ান আশরাফ ফরাসি সিভিল সার্ভিসে যোগ দিয়ে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ‘সিনিয়র অ্যাটাশে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ফরাসি প্রশাসনিক কাঠামোয় এই পদটি নীতি বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। ফ্রান্সের সরকারি প্রশাসনে ‘অ্যাটাশে দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রাসিওঁ দ্য লে’ রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের একটি স্বীকৃত পদমর্যাদা, যার দায়িত্বের মধ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, নীতি বাস্তবায়ন, বিশেষজ্ঞ সহায়তা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম রয়েছে।
সন্তানদের এই অর্জনে গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হাবিবা জেসমিন সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। তিনি জানান, শিক্ষকদের পাশাপাশি বন্ধু, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের উৎসাহ এবং সন্তানদের নিজস্ব কঠোর পরিশ্রমই এই সাফল্য এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্সে গিয়ে প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের এই লড়াই এবং পরবর্তী প্রজন্মের এমন গৌরবজনক অবস্থান প্রমাণ করে যে সঠিক প্রত্যয় ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে যেকোনো প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব।

