আইয়ারের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ওড়ালো ভারত

মঙ্গলবার লক্ষ্ণৌর বিআরএসএবিভি একানা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে আট উইকেটের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে ভারত। অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ারের ৪৩ বলে ঐতিহাসিক অপরাজিত ১০২ রানের টর্নেডো ইনিংস এবং অভিষেক ম্যাচে নামান ধীরের দুর্দান্ত বোলিং পারফরম্যান্স ভারতের এই দাপুটে জয়ের মূল ভিত্তি গড়ে দেয়। ১৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ভারত মাত্র ১৪.৪ ওভারেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায়। এটি আইয়ারের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি এবং এই ফরম্যাটে তার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান।

রেকর্ড ভাঙা ও গড়ার বিধ্বংসী ইনিংস

আইয়ারের এই বিধ্বংসী ইনিংসের অন্যতম হাইলাইট ছিল মাত্র ৪২ বলে পূর্ণ করা সেঞ্চুরি। এটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যৌথ বা এককভাবে দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরি। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার টিম ডেভিড, যিনি ২০২৫ সালে ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে মাত্র ৩৭ বলে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন। পাশাপাশি, আইয়ারের এই সেঞ্চুরিটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে যেকোনো ভারতীয় ব্যাটারের মধ্যে দ্রুততম। তিনি লোকেশ (কেএল) রাহুলের ২০১৬ সালে ফ্লোরিডার লডারহিলে গড়া ৪৬ বলের সেঞ্চুরির রেকর্ডটি ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়েন।

ভারতের অধিনায়ক হিসেবে পুরুষদের টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি করা মাত্র তৃতীয় খেলোয়াড় হলেন শ্রেয়াস আইয়ার। এই তালিকায় তার আগে রয়েছেন রোহিত শর্মা (৩টি সেঞ্চুরি) এবং সূর্যকুমার যাদব (১টি সেঞ্চুরি)। তার অপরাজিত ১০২ রানের ইনিংসটি ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ব্রিস্টলে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা আগের ব্যক্তিগত সেরা অপরাজিত ৮০ রানকে ছাড়িয়ে গেছে। সূর্যকুমার যাদবের কাছ থেকে অধিনায়কত্ব নেওয়ার পর এটি আইয়ারের দ্বিতীয় হাফ-সেঞ্চুরি এবং ক্যারিয়ারের ১১তম টি-টোয়েন্টি ফিফটি, যা তিনি মাত্র ২৮ বলে স্পর্শ করেছিলেন। লক্ষ্ণৌর একানা স্টেডিয়ামের গ্যালারি তাকে দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে সম্মান জানায়।

ইশান কিষানের যোগ্য নেতৃত্ব ও মিডল অর্ডার অংশীদারিত্ব

রান তাড়া করতে নেমে শুরুতেই দুই ওপেনার অভিষেক শর্মা (২১) এবং সঞ্জু স্যামসন (১১) বিদায় নিলে ভারত ৬২/২ রানে পরিণত হয়। তবে অধিনায়ক আইয়ার আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান। তাকে চমৎকার সহযোগিতা করেন ইশান কিষান, যিনি ২৭ বলে ৩৭ রান করেন। এই জুটি মাত্র ৬৮ বলে ১৩৭ রানের ম্যাচজয়ী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে। এই ইনিংস চলাকালীন কিষান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার ৩,০০০ রান পূর্ণ করেন। ১০ ওভার শেষে ভারতের সংগ্রহ ছিল ১০২/২। জয়ের জন্য শেষ ৬০ বলে প্রয়োজন ছিল ৭০ রান, যা আইয়ারের ঝোড়ো ব্যাটিংয়ে মামুলি বিষয়ে পরিণত হয়।

এই ইনিংসের মাঝে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ফিল্ডার ম্যাথিউ ফোর্ড ডিপ কভার থেকে দৌড়ে এসে আইয়ারের একটি নিচু ক্যাচ ধরলেও টিভি আম্পায়ার রোহান পন্ডিত রিপ্লে দেখে নিশ্চিত করেন যে বলটি মাটির স্পর্শ পেয়েছিল। ফলে জীবন ফিরে পান আইয়ার। এই সিদ্ধান্তে ক্যারিবীয় শিবির বিশেষ করে অধিনায়ক শাই হোপ, আকিল হোসেন এবং প্রধান কোচ ড্যারেন স্যামি বেশ হতাশ হন।

অভিষেকেই নামান ধীরের রেকর্ড এবং আকসার প্যাটেলের ম্যাজিক স্পেল

এর আগে টসে হেরে ব্যাট করতে নামা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৭১ রানে অলআউট করতে বড় ভূমিকা রাখেন ভারতের অভিষেককারী অফ-স্পিনার নামান ধীর। তিনি তার ৪ ওভারে মাত্র ৩১ রান দিয়ে ৩টি উইকেট শিকার করেন, যা অভিষেক ম্যাচ খেলা কোনো ভারতীয় স্পিনারের তৃতীয় সেরা বোলিং চিত্র। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে অধিনায়ক শাই হোপ ৩৬ বলে ৫২ রান এবং শেরফেন রাদারফোর্ড ৫৬ রান করেন। হোপের বিদায়ের পরই ক্যারিবীয়দের রানের গতি থমকে যায়। হোপকে আকসার প্যাটেলের ক্যাচে পরিণত করে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক উইকেটের স্বাদ পান নামান ধীর।

পাওয়ারপ্লেতে আকসার প্যাটেল ও আর্শদীপ সিং ক্যারিবীয়দের চেপে ধরেন। কামিল পুরান ১২ রান করে আউটের পর শিমরন হেটমায়ার রানআউটের শিকার হন। এই রানআউটের মাধ্যমে হেটমায়ার ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশিবার (৭ বার) রানআউট হওয়ার লজ্জার রেকর্ড গড়েন, যা আন্দ্রে ফ্লেচারের (৬ বার) চেয়ে বেশি। আকসার প্যাটেলের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে রভম্যান পাওয়েল শূন্য রানে বিদায় নেন। আকসার তার স্পেলে একটি মেডেন ওভার নেন, যা আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তার ষষ্ঠ মেডেন। তিনি এখন ভারতের হয়ে সবচেয়ে বেশি মেডেন ওভার বল করা জাসপ্রিত বুমরাহ (১৩) ও ভুবনেশ্বর কুমারের (১০) পেছনে অবস্থান করছেন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

  • ওয়েস্ট ইন্ডিজ১৭১/১০, ১৯.১ ওভার (শেরফেন রাদারফোর্ড ৫৬, শাই হোপ ৫২; নামান ধীর ৩-৩১, আকসার প্যাটেল ২-২৬)
  • ভারত১৭২/২, ১৪.৪ ওভার (শ্রেয়াস আইয়ার ১০২*, ইশান কিষান ৩৭; রোস্টন চেজ ১-৩৭)
  • ফলাফলভারত ৮ উইকেটে জয়ী